Political Leaders Fashion Sense: সাধারণ শাড়ি থেকে রঙিন জ্যাকেট—পশ্চিমবঙ্গ ও জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতাদের পোশাক কীভাবে তৈরি করে বিশ্বাস, শক্তি ও আদর্শের দৃশ্যমান বার্তা, আর প্রথম দেখাতেই কতটা প্রভাব ফেলে ভোটারদের মনে?
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: ভোট মানেই শুধু প্রতিশ্রুতি, ইস্তেহার, মিছিলের শব্দ বা বক্তৃতা নয়—ভোট মানে এক বিশাল মঞ্চ। আর সেই মঞ্চে রাজনীতিকদের পোশাক যেন নীরব ভাষা। রাজনীতির মঞ্চে কোনও নেতা যখন প্রথমবার মানুষের সামনে আসেন, তাঁর কথা শোনার আগেই চোখে পড়ে তাঁর পোশাক। প্রথম দৃষ্টিতেই তৈরি হয় একটি মানসিক ছবি—এই মানুষটি কেমন? কাছের নাকি দূরের? সহজ নাকি প্রভাবশালী? ঠিক এই জায়গাতেই পোশাক হয়ে ওঠে প্রথম বার্তা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতাদের ফ্যাশন সেন্স দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে তাঁরা কী পরেন? কেন সাদা-সিধে শাড়ি, কেন গেরুয়া কুর্তা, কেন ধুতি-পাঞ্জাবি বা জ্যাকেট? পোশাক কি শুধুই ব্যক্তিগত পছন্দ, নাকি এক সুপরিকল্পিত জনসংযোগ কৌশল?
আরও পড়ুন : রাঘব চাড্ডা: সংসদের মঞ্চে তরুণ কণ্ঠের ঝড় │ কেন বাড়ছে তাঁর জনপ্রিয়তা?
এই প্রতিবেদনে আমরা খুঁজে দেখব পশ্চিমবঙ্গের শাসক, বিরোধী ও বাম-কংগ্রেস শিবিরের প্রথম সারির নেতাদের পোশাকের ধরন। পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতির দুই প্রভাবশালী মুখের ফ্যাশনও তুলে ধরা হবে। কারণ, রাজনীতিতে পোশাক অনেক সময় বক্তব্যের থেকেও বেশি জোরালো হয়ে ওঠে।
রাজ্যের শাসকদলের নেতাদের পোশাক
রাজ্যের প্রধান শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের দলনেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পোশাক নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। সাদা খোলের সুতির শাড়ি, সাথে নীল বা সবুজ কাজ করা সরু পাড়ের শাড়ি, হাওয়াই চটি পড়তেই তিনি বেশি ভালবাসেন। প্রথম রাজনৈতিক মঞ্চে পা রাখার সময় হোক, বিরোধী নেত্রী থেকে শাসক দলের মুখ্যমন্ত্রী তার পোশাকের পরিবর্তন দেখা যায়নি। এই চেহারাই যেন তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। বহু বছর ধরে তিনি একই ধাঁচ বজায় রেখেছেন। এই ধারাবাহিকতা সাধারণ মানুষের মনে এক বিশ্বাস তৈরি করেছে—তিনি ‘মাটির মানুষ’। তাঁর পোশাকে আড়ম্বর নেই, নেই বিলাসিতার ছাপ। বরং আছে এক ধরনের প্রতিবাদী সরলতা।
দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাজে আধুনিকতার ছোঁয়া স্পষ্ট। সাধারণত পরেন পাঞ্জাবি-পায়জামা অথবা হালকা রঙের কুর্তা। কখনও কখনও জ্যাকেটও দেখা যায়। তাঁর পোশাকে এক ধরনের শহুরে পরিমিতিবোধ আছে। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ রাখতে তিনি ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেল রাখেন। পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি ও মাপমতো পোশাক তাঁর জনসভায় উপস্থিতিকে আলাদা মাত্রা দেয়। রাজনীতিতে আসার পর থেকেই তিনি বারবার গুরুত্ব দিয়েছেন জনসংযোগের দিকে। তাকে যেমন পাঞ্জাবি কুর্তা তে দেখা গেছে, তেমনি টি শার্টে ও তিনি মন কেড়েছেন। এমনকি জিমে তার মীরর লুক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন ঘরের ছেলে।
বাংলার রাজনীতির আঙিনায় মহুয়া মৈত্রের উপস্থিতি মানেই এক বুদ্ধিদীপ্ত আভিজাত্য। তাঁর পোশাক নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে এক ধরনের সচেতন রুচিবোধ কাজ করে। তাঁকে অধিকাংশ সময় দেখা যায় বাছাই করা হ্যান্ডলুম বা তাতের শাড়িতে। বিশেষ করে ঢাকাই জামদানি, চওড়া পাড়ের সুতির শাড়ি বা লিনেনের প্রতি তাঁর অনুরাগ স্পষ্ট। জনসভায় হোক বা সংসদে—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর শাড়ি পরার ধরনটি অত্যন্ত মার্জিত এবং সুবিন্যস্ত। মহুয়া মৈত্র তাঁর সাজে অতি সাধারণের মাঝেও আভিজাত্য বজায় রাখতে পছন্দ করেন। তাঁর হাতের দামী ঘড়ি এবং বিশেষ করে তাঁর হ্যান্ডব্যাগ (যেমন লুই ভিতোঁ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড) নিয়ে বহুবার রাজনৈতিক মহলে চর্চা হয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, রাজনীতি মানেই কেবল অগোছালো থাকা নয়, বরং পরিপাটি থাকাও এক ধরনের ব্যক্তিত্বের পরিচয়। কানে ছোট দুল বা গলায় একটি সরু হার—এই নূন্যতম অলংকারেই তিনি স্বচ্ছন্দ। তাঁর রোদ চশমার সংগ্রহও অত্যন্ত আধুনিক, মহুয়ার ফ্যাশন কেবল পোশাকেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর কথা বলার ভঙ্গি এবং আত্মবিশ্বাসী হাঁটাচলাও তাঁর স্টাইলের অঙ্গ।
অন্যদিকে তৃণমূলে যোগ দেওয়া একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী জনসভায় কখনও শাড়ি, কখনও পাঞ্জাবি বা কুর্তা পরে আসেন, যাতে তারকাখ্যাতি বজায় থাকে কিন্তু অতিরিক্ত চাকচিক্য না দেখা যায়। রাজনৈতিক মঞ্চে তাঁদের পোশাক হয়ে ওঠে সংযমী, যাতে ‘জনতার প্রতিনিধি’ ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে।

বিরোধীদলের নেতাদের পোশাকের ট্রেন্ড
রাজ্যে প্রধান বিরোধীদল বিজেপি। রাজ্যের বিরোধী শিবিরে পোশাকের ধরন অনেকটাই আলাদা। শুভেন্দু অধিকারী সচরাচর পাজামা আর হাফ হাতা পাঞ্জাবিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। মাঝেমধ্যে তাতে যুক্ত হয় দলের উত্তরীয়। কখনও কাঁধে দলীয় গামছা। তাঁর পোশাকে স্পষ্টভাবে দলীয় রঙের উপস্থিতি থাকে। এটি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ।
দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ ছোট হাতা পাঞ্জাবি আর হাফ পাজামায় অনেকটা শ্রমিকের মেজাজে থাকেন। শরীরচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহের ছাপ তাঁর সুঠাম পোশাক নির্বাচনেও ফুটে ওঠে।
বর্তমান রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সাধারণত পাঞ্জাবি বা কুর্তা পরেন। সুকান্ত মজুমদারের পোশাকে কখনও গেরুয়া স্কার্ফ, কখনও সাদামাটা কুর্তা দেখা যায়। তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে তিনি ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মধ্যেই দলীয় রঙের উপস্থিতি রাখেন।
ভোটের আগে রাজনৈতিক প্রচারে এ রাজ্যে এসেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দেশের প্রধানমন্ত্রীর পোশাক নিয়ে ও জাতীয় স্তরে বহু আলোচনা হয়েছে। জাতীয় স্তরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ফ্যাশন সেন্স বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। হাফ হাতা ‘মোদী কুর্তা’, রঙিন জ্যাকেট আর বিশেষ উপলক্ষে বিচিত্র ধরনের পাগড়ি বা টুপি—সব মিলিয়ে তিনি নিজের পোশাকে ভারতের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরেন। তাঁর পোশাক সবসময় পরিপাটি এবং ইস্ত্রি করা, যা তাঁর নিয়মানুবর্তিতার প্রতীক। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাজপোশাকে ফুটে ওঠে এক গম্ভীর রাজকীয় মেজাজ। ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর খাদি জ্যাকেটে তিনি ভারতীয় রাজনীতির দলীয় শৃঙ্খলার প্রতিফলন ঘটান।
বাম শিবিরে মহম্মদ সেলিম বা সুজন চক্রবর্তীর পোশাক মানেই সেই চিরচেনা সাদা পাজামা আর ধবধবে পাঞ্জাবি। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের শতরূপ ঘোষ বা মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে চিত্রটা একটু ভিন্ন। মীনাক্ষী সাধারণ সুতির শাড়িতে নিজেকে মাটির কাছের নেত্রী হিসেবে তুলে ধরেন, যা অনেকটা বামপন্থী আদর্শের প্রতিফলন। অন্যদিকে শতরূপ ঘোষ আধুনিক ফিটিংয়ের পাঞ্জাবিতে তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়। বাম শিবিরের প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাদের ধুতি পাঞ্জাবিতেই দেখা যায় বেশি। বর্তমান প্রজন্মের নেতাদের পাঞ্জাবি কুর্তা আবার অনেক সময় টিশার্ট বা শার্টেও তারা সমান সচ্ছন্দ।
কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী সাধারণত সাদা কুর্তা-পায়জামা পরেন। কখনও জ্যাকেট। তাঁর পোশাকে আঞ্চলিকতার ছাপ স্পষ্ট।
রাজনীতিতে পোশাক কখনও কাকতালীয় নয়। সাদা মানে সরলতা, গেরুয়া মানে আদর্শের প্রতীক, জ্যাকেট মানে দৃঢ় ব্যক্তিত্ব—এই সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এক দৃশ্যমান বার্তা। ভোটের বাজারে নেতাদের পোশাক তাই হয়ে ওঠে প্রচারের নীরব অস্ত্র। ভোটের বাজারে মানুষ শুধু কথায় নয়, চোখ দিয়েও বিচার করে। তাই বলা যায়, রাজনীতির মঞ্চে পোশাকই অনেক সময় প্রথম প্রচার, প্রথম প্রতিশ্রুতি এবং প্রথম ইম্প্রেশন। শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল যাই হোক, নেতাদের ফ্যাশন সেন্স যে জনমানসে এক অদৃশ্য প্রভাব ফেলে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
#IndianPolitics #MamataBanerjee, AbhishekBanerjee #MahuaMoitra #SuvenduAdhikari #NarendraModi #AmitShah
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

