Saat Pake Bandha Moscow Festival: ১৯৬৩ সালে যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেছিলেন সুচিত্রা সেন, দীর্ঘ ৬৩ বছর পর সেখানেই আবার প্রদর্শিত হলো অজয় করের কালজয়ী মাস্টারপিস। কীভাবে লন্ডনের ভয়াবহ আগুনের গ্রাস থেকে উদ্ধার করে পুনরুদ্ধার করা হলো এই হারিয়ে যাওয়া ছবিটিকে? জানুন সেই রোমাঞ্চকর গল্প।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: গত সপ্তাহে সুদূর রাশিয়ার মস্কো শহরের একটি প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের মধ্যে এক অদ্ভুত পিনপতন নীরবতা এবং আবেগের ঢেউ খেলা করছিল। রূপালি পর্দায় তখন এক যুগান্তকারী দৃশ্য চলছে, যেখানে প্রবল আবেগে ভাসতে ভাসতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরনের পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ফেলছেন সুচিত্রা সেন, আর চরম ঘৃণায় তাঁকে একজন মিথ্যেবাদী এবং জঘন্য মানুষ বলে তিরস্কার করছেন। এই দৃশ্য দেখে মস্কোর দর্শকদের চোখেও জল চলে এসেছিল। এটি কোনো নতুন দিনের আর্টহাউস সিনেমার দৃশ্য নয়; এটি ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের এক সোনালি ইতিহাসের পুনরুত্থান।
দীর্ঘ ৬৩ বছর পর মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (Moscow International Film Festival) মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে আবারও ফিরে এল বাঙালি দর্শকদের চিরকালীন নস্টালজিয়া সাত পাকে বাঁধা (Saat Pake Bandha)। ১৯৬৩ সালের এই উৎসবের তৃতীয় আসরেই এই অবিস্মরণীয় ছবির জন্য সেরা অভিনেত্রীর সম্মান ছিনিয়ে নিয়েছিলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। আর এতগুলো দশক পেরিয়ে এসেও সেই একই ছবির আবেদন যে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে একটুও ম্লান হয়নি, তা আরেকবার প্রমাণ হয়ে গেল এই প্রদর্শনীতে। একটি ছবির নেতিবাচক রিল কীভাবে লন্ডন শহরের এক বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পরও প্রযুক্তির হাত ধরে ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে এল, আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা সেই অজানা রোমাঞ্চকর যাত্রার কথাই আপনাদের শোনাব।
ফিরে দেখা এক সোনালি অধ্যায় এবং সুচিত্রা-সৌমিত্র নস্টালজিয়া (Saat Pake Bandha Moscow Festival)
ষাটের দশকের বাংলা সিনেমা মানেই এক আলাদা আবেগ, এক অন্যরকম মননশীলতা। প্রখ্যাত পরিচালক অজয় কর, যাঁর হাত ধরে আমরা পেয়েছিলাম ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’ বা ‘পরিণীতা’-র মতো অবিস্মরণীয় সব সৃষ্টি, তাঁরই অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ ছিল এই ছবিটি। কালের নিয়মে আজ আর এই ছবির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা মানুষেরা আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাঁদের শিল্পের ব্যাপ্তি যে মৃত্যুঞ্জয়ী, তা মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবের ‘আউট অফ কম্পিটিশন’ (Out of competition) বিভাগে এই ছবির স্ক্রিনিং থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। সুচিত্রা সেনের কন্যা মুনমুন সেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে জানিয়েছেন যে, তাঁর মায়ের কাছে এই আন্তর্জাতিক পুরস্কারটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পেতে তাঁর অনেক দেরি হয়ে গেলেও, মস্কোর এই সেরা অভিনেত্রীর সম্মানটি এসেছিল তাঁর জনপ্রিয়তার একেবারে চূড়ান্ত শিখরে থাকাকালীন। মুনমুন সেন আরও মনে করিয়ে দেন যে, এই ছবির মূল উপজীব্য হলো কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত অহংকার এবং বাইরের পারিপার্শ্বিক চাপ একটি সুন্দর বৈবাহিক সম্পর্ককে তিল তিল করে ধ্বংস করে দিতে পারে।
অন্যদিকে, কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা পৌলোমী বসু জানিয়েছেন যে, যখন এই কালজয়ী ছবিটি তৈরি হয়েছিল তখন তাঁর জন্মও হয়নি। কিন্তু যখন তিনি একটু বড় হন, তখন তাঁর বাবা অর্থাৎ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজেই উদ্যোগী হয়ে তাঁকে ছবিটি দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
পৌলোমী বসুর কথায়, তাঁর বাবা সবসময় বলতেন যে এই ছবিটি তৎকালীন সময়ের থেকে চিন্তাভাবনার দিক দিয়ে অনেক বেশি এগিয়ে ছিল (ahead of its time)। মস্কোয় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অফ মিশন নিখিলেশ গিরি জানিয়েছেন যে, ছবিটি যখন প্রথম রাশিয়ায় মুক্তি পেয়েছিল, তখন সেখানকার দর্শকরা এটিকে বিপুল মাত্রায় ভালোবেসেছিলেন। আর এত বছর পর সেই একই ছবি দেখে আজকের প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যেও যে তীব্র আবেগের সঞ্চার হয়েছে, তা স্বচক্ষে দেখতে পাওয়া সত্যিই এক অসাধারণ অনুভূতি। একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষার, ভিন্ন সংস্কৃতির ছবি কীভাবে দেশকালের গণ্ডি পেরিয়ে সার্বজনীন মানবিক আবেগকে ছুঁয়ে যেতে পারে, সাত পাকে বাঁধা (Saat Pake Bandha) যেন তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
আগুনের গ্রাস থেকে উদ্ধার (Saat Pake Bandha Moscow Festival)
এই ঐতিহাসিক ছবিটি যে আজ আমরা পুনরায় ঝকঝকে প্রিন্টে দেখতে পাচ্ছি, তার পেছনের গল্পটা কিন্তু কোনো রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। ছবির প্রযোজক ছিলেন বিখ্যাত আর.ডি. বনশল, যাঁর প্রযোজনা সংস্থা আর.ডি. বনশল প্রোডাকশনস থেকে ১৯৬৩ সালে এই মাস্টারপিসটি মুক্তি পেয়েছিল। প্রযোজকের নাতনি বর্ষা বনশল জানিয়েছেন এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা।
দক্ষিণ লন্ডনের সাউথ নরউডে অবস্থিত হেন্ডারসন ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে (Henderson’s Film Laboratories) এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এই ছবির অরিজিনাল নেগেটিভগুলি সম্পূর্ণভাবে পুড়ে চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। একটি কালজয়ী শিল্পের এমন অকালমৃত্যু মেনে নেওয়া ছিল সত্যিই খুব কঠিন। কিন্তু হাল ছাড়েননি ছবির সাথে যুক্ত মানুষেরা। অবশেষে ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন – ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়া (NFDC-NFAI)-এর উদ্যোগে একটি ৩৫ এমএম প্রিন্ট (35mm print) থেকে এই ছবিটিকে পুনরুদ্ধার করার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়।
ছবির এই পুনর্জন্ম বা রেস্টোরেশন প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। বর্ষা বনশল জানিয়েছেন যে, অ্যানালগ ফরম্যাটে থাকা ছবিটিকে ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তরিত করার জন্য অত্যাধুনিক ‘আরি ডিজিটাল স্ক্যানার’ (ARRI digital scanners) ব্যবহার করা হয়েছিল।
শুধু তাই নয়, ছবিটির প্রতিটি ফ্রেম ধরে ধরে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করা হয়। ফিল্মের গায়ে জমে থাকা ধুলোবালি, ইমালশন, এবং সময়ের আঁচড়ে তৈরি হওয়া সমস্ত দাগ মুছে ফেলা হয়। ছবির শব্দের মান বা অডিও ট্র্যাকেও ছিল প্রচুর গোলমাল; সেখান থেকে নয়েজ, পপস এবং ক্লিক শব্দগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সারিয়ে তোলা হয়। এই পুরো প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে এনএফডিসি-এনএফএআই-এর আধিকারিকদের কয়েক মাস সময় লেগেছিল। যদিও বর্ষা বনশল মনে করেন যে, ছবির আসল দৃশ্যগত ও শ্রুতিগত গুণের হয়তো মাত্র ৮০ শতাংশই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবুও হারিয়ে যাওয়া একটি রত্নকে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের সামনে আবার বড় পর্দায় তুলে আনতে পারাটাই এক বিশাল বড় সার্থকতা। ধ্বংসস্তূপ থেকে এভাবেই ফিনিক্স হয়ে ফিরে এল বাংলা সিনেমার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে বাংলা সিনেমার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা (Saat Pake Bandha Moscow Festival)
মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো এক বিশাল এবং বিশ্ববন্দিত মঞ্চে বাংলা ছবির এই পুনরাবির্ভাব নিছকই কোনো ঘটনা নয়, এর একটি গভীর কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা এই উৎসবের সিলেকশন কমিটির সদস্য নিনা কোচেলেভা (Nina Kochelyaeva) স্বয়ং রাশিয়ান দর্শকদের সামনে এই ছবিটির আনুষ্ঠানিক পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁর মতে, এই ক্লাসিক সিনেমাটির প্রত্যাবর্তন বাংলা চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা (historical continuity) সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, এই পদক্ষেপ চলচ্চিত্র শিল্পের দুনিয়ায় রাশিয়া এবং ভারতের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, তাকে আরও সুদৃঢ় করতে সাহায্য করবে। শিল্প যে কাঁটাতার আর ভৌগোলিক সীমানা মানে না, এই উদ্যোগ যেন তারই এক জীবন্ত প্রমাণ।
এই বিশেষ স্ক্রিনিংয়ে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত রাশিয়ান চলচ্চিত্র ইতিহাসবিদ ম্যাক্সিম পাভলভ (Maxim Pavlov)। সত্তরের এবং আশির দশকে ভারতীয় বিশেষ করে বাংলা সিনেমার প্রতি তাঁর অগাধ অনুরাগের কথা তিনি স্মরণ করেছেন। সেই সময়ে তিনি সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেনের অগণিত ছবি দেখেছেন। এমনকি খুব সম্প্রতি রাশিয়া এবং এর আশেপাশের অঞ্চলগুলিতে সত্যজিৎ রায়ের প্রায় আধ ডজন ছবি নতুন করে প্রদর্শিত হতেও তিনি দেখেছেন। কিন্তু পাভলভ আক্ষেপ করে জানান যে, রাশিয়ার বর্তমান প্রজন্মের দর্শকরা এই কালজয়ী ছবিগুলোর কথা প্রায় জানেই না। আর ঠিক এই কারণেই এই ধরণের ক্ল্যাসিক ছবিগুলোর বিশ্বমঞ্চে বারবার প্রদর্শিত হওয়া ভীষণ জরুরি।
পাভলভ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, সত্যজিৎ রায়, জাপানের কিংবদন্তি পরিচালক ইয়াসুজিরো ওজু (Yasujiro Ozu), কিংবা সুইডিশ মাস্টারপিস স্রষ্টা ইংমার বার্গম্যানের (Ingmar Bergman) ছবিগুলিতে ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক কাঠামোর সংকটকে যেভাবে তুলে ধরা হতো, সাত পাকে বাঁধা (Saat Pake Bandha) ঠিক সেই একই ঘরানার এবং সমতুল্য গভীরতার একটি ছবি। বিবাহিত জীবনের অন্তর্দ্বন্দ্বের এই চিরন্তন উপাখ্যান তাই মস্কোর দর্শকদের হৃদয়ে আজও সমানভাবে নাড়া দিয়ে যায়। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের যে সৃজনশীলতা একদিন গোটা বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল, এই ঘটনা আমাদের সেই সোনালি অতীতের কথাই আবারও মনে করিয়ে দেয়।
#newsoffbeat #SaatPakeBandha #SuchitraSen #SoumitraChatterjee #BengaliCinema #MoscowFilmFestival #NFDC
সাম্প্রতিক পোস্ট
- দিনের ২৪ ঘণ্টা বদলে দিতে পারে আপনার জীবন! জানুন, সময় ব্যবহারের এই সহজ কৌশল
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- শালিমার বাগের ভবিষ্যৎ রহস্য: প্রেম, স্মৃতি আর সময়কে ছাপিয়ে ভবিষ্যৎ কি বদলে দেবে ইতিহাস?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- গ্যাস সিলিন্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যায়? এই ৬টি সহজ টিপস জানলে সিলিন্ডার

