Samik Bhattacharya on Madan Mitra: ‘ও লাভলি’ বলে মদন-বন্দনা শমীকের!
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: ভোটের উত্তাপে যখন রাজ্য রাজনীতি ফুটছে, শাসক ও বিরোধীদের বাক্যবাণ যখন ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে, ঠিক সেই রকম এক আবহে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মেজাজে ধরা দিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। আনন্দবাজার পোর্টালে অনিন্দ্য জানাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে একথা জানান তিনি। রাজনীতির চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে, প্রতিপক্ষ শিবিরের এক দাপুটে ও রঙিন নেতাকে নিয়ে তাঁর এমন অকপট মন্তব্য এখন রাজনৈতিক মহলে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা হেভিওয়েট নেতা দিলীপ ঘোষের সঙ্গে কামারহাটির তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্রের তুলনামূলক একটি প্রশ্নে শমীক ভট্টাচার্য যে উত্তর দিয়েছেন, তা একদিকে যেমন হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে দলের অন্দরের মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ (Psychological Equation) নিয়েও নতুন করে ভাবাচ্ছে বাংলার মানুষকে।
সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ পর্বে ছিল একটি ‘র্যাপিড ফায়ার’ বা দ্রুত প্রশ্নোত্তর পর্ব। সাংবাদিক অনিন্দ্য জানা অত্যন্ত সুকৌশলে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন রাজ্য বিজেপি সভাপতির দিকে। প্রশ্নটি ছিল, “কে বেশি কালারফুল? মদন মিত্র না দিলীপ ঘোষ?” এই প্রশ্নের উত্তরে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে, স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হেসে ওঠেন শমীক ভট্টাচার্য। তিনি তৎক্ষণাৎ কামারহাটির তৃণমূল বিধায়কের বিখ্যাত ক্যাচফ্রেজ (Catchphrase) অনুকরণ করে বলে ওঠেন, “আরে ও লাভলি! মদনদার থেকে কালারফুল কেউ আছে নাকি? মদনদা মদনদাই! দিলীপ ঘোষ ওর ধারে কাছেও যেতে পারবেন না এই ব্যাপারে।” এখানেই থেমে থাকেননি শমীক, তিনি আরও একধাপ এগিয়ে নিজের দলীয় সতীর্থকে সতর্ক করার মতো করে যোগ করেন, “আর যেতেও দেবো না আমি। যেতে চাইলে আটকে দেব।“
ভোটের এই চরম উত্তেজনার আবহে একজন বিরোধী দলের রাজ্য সভাপতির মুখে শাসক দলের নেতার এমন ‘রঙিন’ প্রশস্তি স্বাভাবিকভাবেই সবাইকে অবাক করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শমীক ভট্টাচার্যের এই মন্তব্যের গভীরে লুকিয়ে আছে এক সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বার্তা। রাজনীতিতে ‘কালারফুল’ বা রঙিন শব্দটির একাধিক অর্থ হতে পারে। মদন মিত্র বাংলার রাজনীতিতে এমন একজন চরিত্র, যিনি তাঁর বর্ণময় পোশাক, চোখে রোদচশমা, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ ভিডিও, গান গাওয়া এবং নানারকম বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য সর্বদাই খবরের শিরোনামে থাকেন। তিনি রাজনীতিটাকে অনেক বেশি বিনোদনমূলক মোড়কে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। অন্যদিকে, দিলীপ ঘোষের রাজনৈতিক উত্থান এবং পরিচিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর। তিনি সকালে পার্কে প্রাতর্ভ্রমণ করেন, হাতে লাঠি ঘোরান এবং অত্যন্ত কড়া, আগ্রাসী ভাষায় বিরোধীদের আক্রমণ করেন। তাঁর এই রাফ-অ্যান্ড-টাফ ইমেজ (Rough and tough image) বিজেপির নিচুতলার কর্মীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
শমীক ভট্টাচার্য তাঁর মন্তব্যের মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে এই দুই ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে একটি লক্ষ্মণরেখা টেনে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দিলীপ ঘোষের নিজস্ব একটি পরিচিতি এবং গাম্ভীর্য রয়েছে। তিনি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একজন শক্তপোক্ত মুখ। তাঁকে কোনোভাবেই মদন মিত্রের মতো ‘রঙিন’ বা বিনোদনমূলক ছাঁচে ফেলা উচিত নয়। আর রাজ্য সভাপতি হিসেবে তিনি নিজেও চাইবেন না যে তাঁর দলের কোনো শীর্ষ নেতা এমন কোনো কাজ করুন, যা মানুষের কাছে তাঁকে ‘কালারফুল’ প্রমাণ করে। বিজেপির মতো একটি আদর্শগত শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী দলের নেতার কাছে ‘কালারফুল’ তকমাটি খুব একটা ইতিবাচক নয়। তাই তিনি হেসে উড়িয়ে দিলেও, এই বার্তার মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি (Party Image) রক্ষার দিকটিই সুনিশ্চিত করেছেন।
এই সাক্ষাৎকারে শমীক ভট্টাচার্যের নিজের রাজনৈতিক অবস্থান এবং দলের ভেতরের সমীকরণ নিয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে এসেছে। রাজ্য রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি চর্চা রয়েছে যে, রাজ্য বিজেপিতে বর্তমানে একটি ‘শমীক লাইন’ চলছে, যা আগের ‘দিলীপ লাইন’-এর থেকে অনেকটাই আলাদা। দিলীপ ঘোষ যখন রাজ্য সভাপতি ছিলেন, তখন তাঁর শব্দচয়ন এবং শরীরী ভাষা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ছিল। অন্যদিকে, শমীক ভট্টাচার্যকে অনেকেই বিজেপির ‘নরম হিন্দুত্বের মুখ’ (Soft Hindutva Face) বলে মনে করেন। তিনি অত্যন্ত সুবক্তা, কবিতা ভালোবাসেন, আড্ডা দিতে ভালোবাসেন এবং নাগরিক সমাজের কাছে তাঁর একটি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
তবে এই বিভাজন মানতে নারাজ শমীক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, তিনি দলের একজন আদর্শ প্রোডাক্ট। দলের বাইরে তাঁর নিজস্ব কোনো লাইন নেই। দিলীপ ঘোষকে তিনি দলের ‘রক্ত ও মাংস’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, দিলীপ ঘোষ দলে যেমন প্রাসঙ্গিক ছিলেন, তেমনই আছেন। দুজনের কথা বলার ধরন আলাদা হতে পারে, কিন্তু দলের মূল আদর্শ এবং লক্ষ্যের প্রশ্নে তাঁরা সম্পূর্ণ এক। শমীক ভট্টাচার্য মনে করেন, ভারতের মাটিতে হিন্দুত্ব কোনো বিভাজনের নাম নয়, এটি একটি প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শন (Progressive and Inclusive Philosophy)। তিনি রামানুজ থেকে শুরু করে শংকরাচার্যের উদাহরণ টেনে বুঝিয়েছেন যে, ভারতীয় সমাজ সবসময়ই উদারতার পরিচয় দিয়ে এসেছে।
শমীক ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক জীবনের আরও একটি আকর্ষণীয় দিক হলো বামপন্থীদের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক। তাঁকে অনেক সময় রাজনৈতিক মহলে মজা করে ‘বামপন্থী বিজেপি’ বলা হয়। কারণ, বিরোধী শিবিরে থাকলেও বামপন্থী নেতাদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত রসায়ন অত্যন্ত ভালো। এই সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বিধানসভায় যখন তিনি দলের একমাত্র বিধায়ক ছিলেন, তখন বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র এবং কংগ্রেস নেতা তাপস রায় তাঁকে কথা বলার জন্য নিজেদের বরাদ্দ সময় থেকে কিছুটা সময় ছেড়ে দিতেন। এর জন্য তিনি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। তবে রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে তিনি বামপন্থাকে বর্তমানে অবৈজ্ঞানিক এবং অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন। তাঁর মতে, ডারউইনের তত্ত্ব যেমন আজ আর প্রাসঙ্গিক নয়, ঠিক তেমনই আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে বামপন্থাও অচল। তিনি বামপন্থী কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তাঁরা যেন তৃণমূলকে উৎখাত করার এই লড়াইয়ে বিজেপির হাত শক্ত করেন।
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি। তিনি মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে পশ্চিমবঙ্গ একটি ‘পরিযায়ী রাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। মেধা, শ্রম, পুঁজ—সবকিছুই এই রাজ্য থেকে চলে যাচ্ছে। একসময় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি ‘স্বপ্নের মেঘবালিকা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, আজ তাঁকেই তিনি ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ বলে কটাক্ষ করেছেন। শমীকের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়ে গেছে এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাদের বিসর্জন নিশ্চিত। তিনি দাবি করেছেন, এখন আর লড়াই কেবল তৃণমূল বনাম বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এই লড়াই এখন ‘জনতা বনাম মমতা’ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সাধারণ মানুষ নিজেরাই তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে গর্জে উঠছেন।
এই সাক্ষাৎকারে রাজ্য বিজেপি সভাপতির ব্যক্তিগত জীবনের কিছু অজানা ও চমকপ্রদ দিকও উঠে এসেছে। তিনি চিরকুমার। একা থাকতেই ভালোবাসেন। তাঁর ভাষায়, জীবন হলো একপ্রকার ‘অবসর যাপন’। তাঁর কোনো নিজস্ব ক্রেডিট কার্ড নেই, অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেন। বিদেশে গিয়ে একবার বিমানে তাঁর কাছে আমেরিকান ক্রেডিট কার্ড না থাকায় খাবার কিনে খেতে গিয়ে প্রবল সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে তিনি যে সহজ সাবলীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা প্রমাণ করে তিনি মাটির কতটা কাছাকাছি থাকা একজন মানুষ।
পরিশেষে বলা যায়, আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি শমীক ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক দর্শন, ব্যক্তিগত জীবন এবং রসবোধের একটি নিখুঁত দলিল হয়ে থাকবে। একদিকে তিনি যেমন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন, অন্যদিকে মদন মিত্র ও দিলীপ ঘোষকে নিয়ে তাঁর ‘ও লাভলি’ মন্তব্য বাংলার রাজনীতিতে একটি নির্মল হাসির উদ্রেক করেছে। রাজনীতি মানেই যে কেবল ভ্রুকুটি আর কাদা ছোঁড়াছুড়ি নয়, সেখানেও যে সুস্থ রসবোধের জায়গা থাকতে পারে, শমীক ভট্টাচার্য সেটাই প্রমাণ করলেন।
আপনার কী মনে হয়? রাজনীতির ময়দানে নেতাদের এমন রসিকতা কি সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তোলে? আপনার মতামত আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না। রাজ্য রাজনীতির এমন আরও অনেক অজানা ও অফবিট খবর পেতে চোখ রাখুন NewsOffBeat-এ।
Most Viewed Posts
- ‘মায়া ভরা রাতি’ আবার ফিরছে—অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে নতুন করে জেগে উঠবে এক চিরন্তন গান
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- বাড়িতে রাখুন এই নয় গাছ, সৌভাগ্য ফিরবেই

