Sensex Crash Today: উইকেন্ডের ছুটির আমেজ কাটিয়ে সোমবার বাজার খুলতেই মাথায় হাত বিনিয়োগকারীদের। মধ্যপ্রাচ্য এবং পাক-আফগান যুদ্ধের জেরে রক্তস্নাত দালাল স্ট্রিট। হু হু করে বাড়ছে সোনা-রুপোর দাম। এই অস্থির বাজারে এখন কি বিনিয়োগ করা উচিত, নাকি সব শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ? কী বলছেন শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা? জানুন বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: শনি ও রবিবারের নিশ্চিন্ত ছুটি কাটিয়ে সোমবার সকালে যারা ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনে ট্রেডিং অ্যাপটি খুলেছিলেন, তাদের জন্য আজকের সকালটা একেবারেই সুখকর ছিল না। ছুটির মেজাজ নিমেষেই পরিণত হয়েছে চরম আতঙ্কে। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বাজার খুলতেই দালাল স্ট্রিটে আছড়ে পড়েছে বিক্রির সুনামি। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (BSE) সূচক সেনসেক্স (Sensex) ১০০০ পয়েন্টের বেশি নিচে নেমে যায়। পাশাপাশি ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (NSE) নিফটি (Nifty)-ও প্রায় ৩০০ পয়েন্টের বেশি পতন দেখেছে।
বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও থেকে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা নিমেষেই উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু কেন এই হঠাৎ ধস? ভারতের অর্থনীতি তো যথেষ্ট শক্তিশালী, জিডিপি (GDP) গ্রোথও ভালো, তাহলে বাজারের এই রক্তস্নাত অবস্থার কারণ কী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের দেশের সীমানার বাইরে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক অত্যন্ত জটিল এবং ভয়ংকর সমীকরণের মধ্যে।
আপনার কষ্টার্জিত জমানো টাকা এখন কতটা সুরক্ষিত? এই পতন কি আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে? সোনা এবং রুপোর বাজারে এর কী প্রভাব পড়ছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে NewsOffBeat আজ কথা বলেছে দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং বাজার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। আসুন, কোনো রকম আতঙ্কে কান না দিয়ে, একদম তথ্য এবং যুক্তির ওপর ভিত্তি করে বর্তমান শেয়ার বাজারের একটি সম্পূর্ণ অ্যানালিটিক্যাল বা বিশ্লেষণমূলক চিত্র দেখে নেওয়া যাক।
১০০০ পয়েন্ট পতনের নেপথ্যে ‘জোড়া যুদ্ধ’
শেয়ার বাজার খুব সেনসিটিভ বা সংবেদনশীল একটি জায়গা। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে একটা গুলি চললেও তার প্রভাব দালাল স্ট্রিটে এসে পড়ে। গত উইকেন্ডে (২৪ ও ২৫শে ফেব্রুয়ারি) যখন ভারতীয় বাজার বন্ধ ছিল, ঠিক সেই সময়েই আন্তর্জাতিক স্তরে ঘটে গেছে দুটি বিশাল ঘটনা।
প্রথমত, মার্কিন ও ইজরায়েলি বাহিনীর অতর্কিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু, যার জেরে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন যুদ্ধের দামামা। ইরান যেকোনো মুহূর্তে প্রত্যাঘাত করতে পারে, এই আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের ঠিক প্রতিবেশী দুই দেশ—পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে শুরু হয়েছে এক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ।
এই ‘জোড়া যুদ্ধ’-এর কারণে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন বা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (FIIs) এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতের মতো উদীয়মান বাজার (Emerging Markets) থেকে নিজেদের টাকা দ্রুত তুলে নিচ্ছেন। আর এই বিপুল পরিমাণ ‘প্যানিক সেলিং’ (Panic Selling)-এর ধাক্কাতেই সোমবার সকালে ১০০০ পয়েন্টের পতন দেখেছে সেনসেক্স।
NewsOffBeat-এর এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিবিদ সুজয় সান্যাল
এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি (Macroeconomic situation) ঠিক কতটা চিন্তার? এই বিষয়ে NewsOffBeat-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সুজয় সান্যাল জানাচ্ছেন, “শেয়ার বাজার কখনোই অনিশ্চয়তা বা ‘আনসার্টেনিটি’ পছন্দ করে না। যখনই বিশ্বে যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়, তখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি ‘ফ্লাইট টু সেফটি’ (Flight to Safety) প্রবণতা কাজ করে। অর্থাৎ, তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ ইকুইটি বা শেয়ার বাজার থেকে টাকা তুলে নিয়ে অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত জায়গায় বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। আজকের এই ১০০০ পয়েন্টের পতন কোনো সাধারণ কারেকশন নয়, এটি হলো বৈশ্বিক আতঙ্কের প্রতিফলন।”
সুজয়বাবু আরও ব্যাখ্যা করেন, “ভারতের অর্থনীতির অন্যতম বড় চিন্তার কারণ হলো অপরিশোধিত তেল। আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে যদি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ বা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, তবে ভারতের আমদানি খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে। এর ফলে দেশে মূল্যবৃদ্ধি বা ইনফ্লেশন (Inflation) মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, যা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সুদের হার কমানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই অঙ্কটা বোঝেন বলেই তাঁরা বাজার থেকে টাকা বের করে নিচ্ছেন।”
সোনা ও রুপোর বাজারে আগুন: সেফ হ্যাভেন অ্যাসেটের উত্থান
শেয়ার বাজারের এই পতনের সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত একটি চিত্র দেখা যাচ্ছে কমোডিটি মার্কেটে (Commodity Market)। ইকুইটি মার্কেট যখন রক্তস্নাত, সোনা এবং রুপোর দাম তখন রকেটের গতিতে ওপরে উঠছে।
ঐতিহাসিকভাবেই দেখা গেছে, যুদ্ধ, মহামারী বা অর্থনৈতিক মন্দার সময় সোনা একটি ‘সেফ হ্যাভেন’ (Safe Haven) বা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। কাগজের মুদ্রা বা শেয়ারের দাম যখন কমতে থাকে, সোনার দাম তখন বাড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ইতিমধ্যেই নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভারতের বাজারেও। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ২২ ক্যারেট এবং ২৪ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে কয়েক হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। রুপোর দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলো (Central Banks) এখন বিপুল পরিমাণে সোনা কিনছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বেচে সেই টাকা সোনায় ঢালছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি যতদিন না শান্ত হচ্ছে, সোনা এবং রুপোর এই বুল রান (Bull Run) বা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
এখন কি বিনিয়োগ করা উচিত? কী বলছেন অর্থনীতিবিদ প্রান্তিক চক্রবর্তী?
যাঁদের ইতিমধ্যেই শেয়ার বাজারে বা মিউচুয়াল ফান্ডে (Mutual Fund) কয়েক লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করা আছে, তাঁরা সোমবার সকালে নিজেদের পোর্টফোলিও লাল রঙে দেখে স্বভাবতই আতঙ্কিত। অনেকেই ভাবছেন, “সব শেয়ার বেচে দিয়ে টাকা পকেটে নিয়ে নেব কি না!”
এই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন দেশের আরেক স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশেষজ্ঞ প্রান্তিক চক্রবর্তী। NewsOffBeat-কে তিনি বলেন, “বিনিয়োগকারীদের এখন সবথেকে বেশি যে জিনিসটা প্রয়োজন, তা হলো ধৈর্য (Patience)। বাজার যখন ১০০০ পয়েন্ট পড়ে, তখন ভয় পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস বলছে, প্যানিক করে লসে শেয়ার বিক্রি করাটা হলো একজন বিনিয়োগকারীর সবথেকে বড় ভুল।”
প্রান্তিকবাবু তাঁর বিশ্লেষণে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেছেন:
১. প্যানিক সেলিং থেকে বিরত থাকুন: “আপনার পোর্টফোলিওতে যদি ভালো ফান্ডামেন্টাল (Strong Fundamentals) যুক্ত কোম্পানির শেয়ার থাকে, তবে এই সাময়িক পতনে সেগুলো বিক্রি করবেন না। যুদ্ধ বা জিওপলিটিক্যাল টেনশন বাজারের জন্য সাময়িক। ২-৩ মাসের মধ্যে পরিস্থিতি শান্ত হলে বাজার ঠিক আবার বাউন্স ব্যাক করবে। আপনি যদি আজ লসে বিক্রি করে দেন, তবে সেই রিকভারির সুযোগটা চিরতরে হারাবেন।”
২. সিপ (SIP) বন্ধ করবেন না: “যাঁরা মিউচুয়াল ফান্ডে প্রতি মাসে সিপ (Systematic Investment Plan) করেন, তাঁরা কোনোভাবেই নিজেদের সিপ বন্ধ করবেন না। বাজার নিচে নামলে আপনার সিপ-এর টাকায় আপনি বেশি ‘ইউনিট’ (Units) কিনতে পারবেন। একে বলা হয় ‘রুপি কস্ট অ্যাভারেজিং’ (Rupee Cost Averaging)। দীর্ঘমেয়াদে এই নিচের দিকের বিনিয়োগগুলোই আপনাকে সবচেয়ে বেশি রিটার্ন দেবে।”
৩. ‘বাই অন ডিপস’ (Buy on Dips) কৌশল: “যাঁদের হাতে এই মুহূর্তে অতিরিক্ত ক্যাশ বা নগদ টাকা আছে, তাঁদের জন্য এটি একটি দারুণ সুযোগ। ভালো ব্লু-চিপ কোম্পানির শেয়ারগুলো এখন অনেক সস্তায় বা ডিসকাউন্টে পাওয়া যাচ্ছে। তবে একবারে সব টাকা না ঢেলে, বাজার যত নিচে নামবে, অল্প অল্প করে বিনিয়োগ (Staggered Investment) করা বুদ্ধিমানের কাজ।”
কোন কোন সেক্টরে নজর রাখবেন?
এই অস্থির বাজারে কিছু সেক্টর ক্ষতির মুখে পড়লেও, কিছু সেক্টর আবার লাভবান হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে:
- ফার্মা এবং আইটি (Pharma & IT): এই সেক্টরগুলোকে সাধারণত ‘ডিফেন্সিভ সেক্টর’ (Defensive Sectors) বলা হয়। বাজারের পতনের সময় এই কোম্পানিগুলোর শেয়ার তুলনামূলকভাবে কম পড়ে। এছাড়া আইটি সেক্টরের আয়ের বড় অংশ আসে ডলার থেকে। টাকার দাম পড়লে এদের লাভ বাড়ে।
- ডিফেন্স এবং এনার্জি (Defence & Energy): যুদ্ধের আবহে প্রতিরক্ষাসামগ্রী প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারে জোরদার গতি দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি, তেলের দাম বাড়লে রিলায়েন্স বা ওএনজিসি-র মতো এনার্জি কোম্পানিগুলো ফোকাসে থাকতে পারে।
- এভিয়েশন এবং পেইন্টস (Aviation & Paints): এই কোম্পানিগুলোর কাঁচামাল হলো তেল। তাই তেলের দাম বাড়লে এদের লাভের মার্জিন কমে যায়। আপাতত এই সেক্টরগুলো থেকে একটু দূরে থাকাই শ্রেয়।
শেয়ার বাজার হলো একটি রোলার কোস্টারের মতো। ওপরে ওঠা এবং নিচে নামা—দুটোই এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। সোমবারের এই ১০০০ পয়েন্টের পতন নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা, কিন্তু এটি কোনোভাবেই পৃথিবীর শেষ নয়।
কোভিড-১৯ (COVID-19) মহামারীর সময় ২০২০ সালের মার্চ মাসে বাজার একদিনে ৩০০০-৪০০০ পয়েন্ট পড়েছিল। কিন্তু তারপরের ২ বছরে বাজার যে রিটার্ন দিয়েছে, তা ইতিহাস। আজকের এই পতনও তেমনই একটি ফেজ বা পর্যায়। অর্থনীতিবিদ সুজয় সান্যাল এবং প্রান্তিক চক্রবর্তীর বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই সময়টা হলো মাথা ঠান্ডা রাখার সময়। আপনার বিনিয়োগের লক্ষ্য যদি দীর্ঘমেয়াদী (Long-term) হয়, অর্থাৎ ৫ থেকে ১০ বছর, তবে আজকের এই পতন আগামী কয়েক বছর পর চার্টের একটি ছোট্ট লাল বিন্দু ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না।
তাই রোজ রোজ পোর্টফোলিও খুলে মন খারাপ করবেন না। নিজের আর্থিক উপদেষ্টার (Financial Advisor) সঙ্গে কথা বলুন, ভালো শেয়ার বাছুন এবং ভারতের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক শক্তির ওপর বিশ্বাস রাখুন। মেঘ যতই ঘন হোক, রোদ ঠিক উঠবেই।
#SensexCrash #StockMarketIndia #DalalStreet #SmartMoney #GoldPrices #InvestmentTips #FinancialNews
সাম্প্রতিক পোস্ট
- খামেনেইয়ের মৃত্যু ও ৪০ দিনের শোক! পহলভি রাজবংশের পতন থেকে কীভাবে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছলেন তিনি?
- খামেনেয়ের মৃত্যু! মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কোন দিকে, ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
- রাতের শহরে মহিলাদের সুরক্ষায় বিশেষ বাহিনী রাজ্য সরকারের │ জানুন, কী সেই উদ্যোগ
- আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা! তিন ধাপে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ, কীভাবে জানবেন আপনার নাম আছে কি না?
- লাদাখে বরফের ওপর ম্যারাথন! আফগান-পাক যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগেই চিনের সীমান্তে ভারতের এই পদক্ষেপ কেন মাস্টারস্ট্রোক?

