Shivling Radioactivity Myth: সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবি অনুযায়ী শিবলিঙ্গ নাকি এক প্রাচীন শক্তিকেন্দ্র; কিন্তু ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় এই তত্ত্ব কতটা টিকে থাকে, তারই বিশদ অনুসন্ধান এই প্রতিবেদনে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: কেন শিবলিঙ্গের উপর অবিরাম জল ঢালা হয়? এটি কি কেবল ধর্মীয় আচার, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে রেডিওঅ্যাক্টিভিটির (Radioactivity) কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা? সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউব জুড়ে এই প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ বলছেন, প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা নিউক্লিয়ার টেকনোলজিতে পারদর্শী ছিল; আবার কেউ দাবি করছেন, শিবলিঙ্গ আসলে একধরনের শক্তিকেন্দ্র—যার তেজস্ক্রিয়তা ঠান্ডা রাখতে জল ঢালা হয়।
কিন্তু সত্যি কী? পুরাণ, প্রত্নতত্ত্ব ও আধুনিক পদার্থবিদ্যা—এই তিনের আলোয় বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে আমরা কী পাই? আজকের প্রতিবেদনে আমরা খুঁজে দেখব শিবলিঙ্গের ধর্মীয় তাৎপর্য, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং রেডিওঅ্যাক্টিভিটির দাবির বাস্তবতা।
আরও পড়ুন : ‘ওম’ শব্দের উৎপত্তি কোথায়? মহাবিশ্বের প্রথম ধ্বনির রহস্য
শিবলিঙ্গের আদি অর্থ
হিন্দু দর্শনে শিবলিঙ্গ হল সৃষ্টির অনাদি-অনন্ত শক্তির প্রতীক। “লিঙ্গ” শব্দের অর্থ চিহ্ন বা প্রতীক। অর্থাৎ, শিবলিঙ্গ হল নিরাকার ব্রহ্মের প্রতীকী রূপ। শিব পুরাণ-এ শিবলিঙ্গকে বর্ণনা করা হয়েছে মহাজাগতিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে—যেখানে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের মিলন ঘটে। এটি কোনো মানব-নির্মিত যন্ত্র নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক প্রতীক। তবে কিছু বিকল্প ইতিহাসবিদ দাবি করেন, শিবলিঙ্গের গঠন (উপরের গোলাকার অংশ ও নীচের ভিত্তি) নাকি আধুনিক নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের মতো।
সবসময় জল ঢালার বৈজ্ঞানিক কারণ কী?
হিন্দু ধর্মে শিবলিঙ্গে জল বা দুধ ঢালার প্রথাকে বলা হয় “অভিষেক” (Abhishekam)। এটি একধরনের ভক্তিপূর্ণ আচার।ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, শিব হলেন তপস্বী—তাঁর জটাজুট থেকে গঙ্গা প্রবাহিত। জল ঢালা মানে তাঁর শীতল, কল্যাণময় রূপকে আহ্বান করা। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি যুক্তি পাওয়া যায়—প্রাচীনকালে মন্দিরে পাথরের গঠন গরম হয়ে উঠত। জল ঢাললে তা ঠান্ডা থাকত। নিয়মিত জল প্রবাহ পাথরের উপর জমে থাকা ধুলো বা জীবাণু সরিয়ে দেয়। প্রবাহমান জল মানসিক প্রশান্তি আনে—যা ধ্যান ও উপাসনার জন্য উপযোগী। কিন্তু এটি কোনো নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ঠান্ডা রাখার প্রক্রিয়ার মতো নয়। আধুনিক রিঅ্যাক্টরে বিশেষ কুল্যান্ট সিস্টেম থাকে, যা অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর।
রেডিওঅ্যাক্টিভিটি ও শিবলিঙ্গ
রেডিওঅ্যাক্টিভিটি হল অস্থিতিশীল পরমাণুর নিউক্লিয়াস থেকে শক্তি নির্গমনের প্রক্রিয়া। আধুনিক নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহার করা হয়, যা নিয়ন্ত্রিত বিভাজনের মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন করে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এখনো পর্যন্ত কোনো শিবলিঙ্গে উল্লেখযোগ্য মাত্রার রেডিওঅ্যাক্টিভ উপাদান পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ শিবলিঙ্গ তৈরি হয় পাথর, মার্বেল, গ্রানাইট বা ধাতু দিয়ে। গ্রানাইটে সামান্য প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা থাকতে পারে, কিন্তু তা এতটাই কম যে তা ক্ষতিকর নয়। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, যদি কোনো বস্তু উল্লেখযোগ্য তেজস্ক্রিয় হত, তবে তা সহজেই গাইগার কাউন্টার দিয়ে ধরা যেত। অথচ ভারত বা বিশ্বের কোনো শিবমন্দিরে এমন বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট নেই যা প্রমাণ করে শিবলিঙ্গ বিপজ্জনক রেডিওঅ্যাক্টিভ।
মিথ বনাম বাস্তব
আজকের এই ডিজিটাল সময়ে প্রাচীন উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে নানা তত্ত্ব অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আমরা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের পূর্বপুরুষদের কৃতিত্ব নিয়ে গর্ব অনুভব করতে চাই। অনেকেই বিশ্বাস করতে ভালোবাসেন যে প্রাচীন সভ্যতাগুলি আধুনিক বিজ্ঞানের চেয়েও অগ্রসর ছিল। কিন্তু বিজ্ঞান কেবল বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তার ভিত্তি প্রমাণ, পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ। গল্প, কল্পনা বা আবেগ দিয়ে বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছিল—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শূন্যের ধারণা, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নির্ণয় কিংবা আয়ুর্বেদের বিস্তার—এসবই তাদের মেধা ও গবেষণার উজ্জ্বল প্রমাণ। তবে পরমাণু চুল্লীর মতো জটিল প্রযুক্তির অস্তিত্বের পক্ষে এখনো পর্যন্ত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শিবলিঙ্গের আধ্যাত্মিক শক্তিকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, তার দার্শনিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু তাকে সরাসরি পরমাণু প্রযুক্তির নিদর্শন বলে দাবি করা ইতিহাস ও বিজ্ঞানের প্রতি অবিচার।
শিবলিঙ্গ প্রাচীন পরমাণু চুল্লী—এই দাবি আকর্ষণীয় হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। রেডিওঅ্যাক্টিভিটির তত্ত্বও এখনো কল্পনার পর্যায়েই রয়েছে। জল ঢালার প্রথা মূলত ধর্মীয়, পরিবেশগত ও মানসিক কারণেই প্রতিষ্ঠিত। ধর্ম আমাদের আত্মিক শক্তি দেয়, আর বিজ্ঞান দেয় পরীক্ষিত জ্ঞান। একটিকে আরেকটির জায়গায় বসালে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বরং শিবলিঙ্গকে তার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপটে বুঝে নেওয়াই শ্রেয়।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

