Supreme Court Stray Dog Verdict 2026: দেশজুড়ে কুকুরের কামড়ে আতঙ্কের মাঝেই সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়। এবার হাসপাতাল, স্টেশন, বিমানবন্দরের মতো এলাকায় আর ফেরানো যাবে না পথকুকুর, তৈরি হবে বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: একদিকে ছয় বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু, অন্যদিকে ক্ষুধার্ত পথকুকুরের বেঁচে থাকার লড়াই—এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দিল এক ঐতিহাসিক রায়। রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কুকুরদের শুধু “উপদ্রব” হিসেবে নয়, বরং জীবন্ত প্রাণী হিসেবে দেখার বার্তা দিল দেশের শীর্ষ আদালত। একই সঙ্গে আদালত এটাও স্পষ্ট করে দিল, নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ভয়মুক্ত জীবনের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দেশ জুড়ে ক্রমবর্ধমান কুকুরের কামড়, শিশুদের ওপর হামলা এবং নাগরিক আতঙ্কের আবহে এই রায় এখন শুধু আইনি সিদ্ধান্ত নয়, এক সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে—পথকুকুরদের টিকাকরণ, বন্ধ্যাকরণ ও আশ্রয়ের দায় প্রশাসনের; আবার মানুষকে আতঙ্কে রেখে “অবাধ সহানুভূতি” দেখানোও গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে এই রায় যেন এক নতুন ভারসাম্যের খোঁজ—মানবিকতা বনাম জননিরাপত্তার।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল এই মামলা?
গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পথকুকুরের আক্রমণে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। দিল্লি, কেরল, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ—প্রায় সর্বত্রই কুকুরের কামড় নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের উপর হামলার ঘটনা সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
সম্প্রতি দিল্লিতে ছয় বছরের এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। রাস্তার পাশে খেলতে গিয়ে কয়েকটি বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণের শিকার হয় সে। শুধু দিল্লিই নয়, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত মানুষ Rabies vaccine নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছিল—রাস্তা কি শুধুই পথকুকুরের? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? আবার উল্টোদিকে পশুপ্রেমী সংগঠনগুলোর বক্তব্য ছিল, “মানুষের ব্যর্থ প্রশাসনের শাস্তি কেন প্রাণীদের পেতে হবে?”
এই দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় সুপ্রিম কোর্টে। বিচারপতি বিক্রম নাথ, বিচারপতি সন্দীপ মেহতা এবং বিচারপতি এনভি আঞ্জারিয়ার গঠিত শীর্ষ বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—ভারতের সংবিধান শুধু মানুষের মৌলিক অধিকার নয়, প্রাণীদের প্রতিও সহানুভূতির কথা বলে।
তবে আদালত একইসঙ্গে বলেছে, নাগরিকদের “Dog Bite Terror” থেকে নিরাপদ থাকার অধিকারও মৌলিক অধিকারের অংশ। অর্থাৎ আদালত কোনো একপক্ষের হয়ে নয়, বরং একটি “Balanced Framework” তৈরি করতে চাইছে।
এর আগে ২৫ নভেম্বর ২০২৫ সালে আদালত একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশিকা জারি করেছিল। সেই নির্দেশিকার পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন পশুপ্রেমী সংগঠন আবেদন করলেও সুপ্রিম কোর্ট তা খারিজ করে দেয় এবং আগের রায়ই বহাল রাখে।
তবে এই নতুন রায়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
কোন এলাকায় আর ফেরানো যাবে না পথকুকুর?
এটাই এই রায়ের সবচেয়ে আলোচিত অংশ।
আগের Animal Birth Control (ABC) Rules অনুযায়ী, রাস্তা থেকে কুকুর ধরে তাদের টিকাকরণ ও বন্ধ্যাকরণের পর আবার একই এলাকায় ছেড়ে দেওয়ার নিয়ম ছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এবার বলেছে—সব এলাকায় এই নিয়ম চলবে না।
বিশেষ করে যেসব এলাকায় মানুষের চলাচল অত্যন্ত বেশি, সেখানে আর কুকুরদের ফেরত পাঠানো যাবে না।
যেমন—
- কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা
- হাসপাতাল
- রেলওয়ে স্টেশন
- বাস টার্মিনাস
- বিমানবন্দর
- স্পোর্টস কমপ্লেক্স
- শিশুদের খেলার জায়গা
আদালতের মতে, এই ধরনের “Sensitive Zones”-এ মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
ফলে এইসব জায়গা থেকে ধরা কুকুরদের Sterilization ও Vaccination-এর পর সরকারি অনুমোদিত Dog Shelter বা আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠাতে হবে।
কী কী বাধ্যতামূলক করল আদালত?
সুপ্রিম কোর্ট শুধু নির্দেশ দিয়েই থেমে থাকেনি। কীভাবে সেই নির্দেশ বাস্তবায়িত হবে, তারও স্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী—
- প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্র ফেন্সিং দিয়ে সুরক্ষিত করতে হবে
- কুকুরদের নিয়মিত খাবার ও পানীয় জল দিতে হবে
- চিকিৎসা ও টিকাকরণের ব্যবস্থা রাখতে হবে
- নতুন করে বাইরের কুকুর যাতে ঢুকতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে
- প্রতিটি এলাকায় একজন নোডাল অফিসার নিয়োগ করতে হবে
- পৌরসভা, কর্পোরেশন ও পঞ্চায়েতকে নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে
সবচেয়ে বড় বিষয়, এই নির্দেশ কার্যকর না হলে প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্য সচিবদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা হবে।
অর্থাৎ আদালত এবার শুধু “পরামর্শ” দেয়নি, প্রশাসনিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে চেয়েছে।
হিংস্র কুকুরদের কী হবে?
রায়ের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ সম্ভবত এটিই।
আদালত বলেছে, যেসব কুকুর অত্যন্ত হিংস্র এবং মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, তাদের ক্ষেত্রে “Euthanasia” বা যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
পশুপ্রেমী সংগঠনগুলোর একাংশ এর বিরোধিতা করেছে। তাদের বক্তব্য, “Aggressive behavior”-এর পেছনে প্রায়শই নির্যাতন, ক্ষুধা বা অসুস্থতা দায়ী। ফলে সরাসরি মৃত্যুর সিদ্ধান্ত মানবিক নয়।
অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের একাংশ বলছেন, “মানুষের প্রাণ আগে বাঁচানো উচিত।”
ফলে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ নতুন করে নৈতিক বিতর্কও তৈরি করেছে।
রাস্তার ধারে কুকুরকে খাবার খাওয়ানো নিয়েও কড়া অবস্থান
ভারতের বিভিন্ন শহরে “Dog Feeding” নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিবাদ চলছে। অনেক সময় আবাসনের ভিতরে বা রাস্তায় খাবার দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশীদের মধ্যে সংঘর্ষ পর্যন্ত হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট এবার জানিয়েছে, যেখানে সেখানে কুকুরকে খাবার খাওয়ানো যাবে না। কারণ এতে নির্দিষ্ট এলাকায় কুকুরের জমায়েত বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়।
তবে আদালত এটাও বলেছে, পশুদের খাবার দেওয়া অপরাধ নয়। কিন্তু সেটি “regulated manner”-এ করতে হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট Feeding Zone তৈরির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ভারতের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো হাজার হাজার পথকুকুর হয়তো কোনোদিন আদালতের ভাষা বুঝবে না। কিন্তু এই রায় তাদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে বদলে দিতে পারে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে ভাবনাও।
সুপ্রিম কোর্ট এবার স্পষ্ট করে দিল—মানবিকতা মানে শুধু প্রাণীকে বাঁচানো নয়, মানুষকেও নিরাপদ রাখা। আর সেই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

