TMC Young Candidates 2026: আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ২৯১টি আসনের প্রার্থী তালিকায় এক অভিনব ‘জেনারেশন ব্যালান্স’ বা প্রজন্মের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তারুণ্যকে হাতিয়ার করে ময়দানে নেমেছে শাসকদল। সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন থেকে শুরু করে চিকিৎসক, আইনজীবী—কারা রয়েছেন এই তরুণ ব্রিগেডে? আসুন, বিস্তারিত চিনে নিই ভবিষ্যতের এই নেতাদের।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: নির্বাচন মানেই দেওয়ালে দেওয়ালে স্লোগান, মাইকের আওয়াজ আর রাজনৈতিক উত্তাপ। কিন্তু এই চিরাচরিত রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝে আপনি কি খেয়াল করেছেন, বাংলার রাজনীতির একটা বড় বাঁকবদল ঘটতে চলেছে? ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন শুধু ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, এটি যেন ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির এক বিশাল কর্মশালা। তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) প্রকাশিত ২৯১ জন প্রার্থীর তালিকার দিকে চোখ রাখলেই এই চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে যায়।
দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবার প্রার্থী তালিকায় অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তারুণ্যকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, এই তালিকায় এমন ৪ জন প্রার্থী রয়েছেন যাঁদের বয়স ৩১ বছরের নিচে এবং ৩৮ জন প্রার্থীর বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এই তরুণ মুখের ছড়াছড়ি প্রমাণ করে যে, শাসকদল আগামী দিনের জন্য একটি মজবুত ও সুশৃঙ্খল দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব প্রস্তুত করতে চাইছে। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি ডিজিটাল জনসংযোগ, পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার—সবকিছুর এক অদ্ভুত মিশেল রয়েছে এই তরুণ ব্রিগেডে।
আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা নিউজ অফবিটের পাঠকদের জন্য তুলে ধরব তৃণমূল কংগ্রেসের সেইসব চর্চিত এবং উল্লেখযোগ্য তরুণ প্রার্থীদের কথা, যাঁরা আগামী দিনের বাংলার রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে চলেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন থেকে ছাত্র রাজনীতির লড়াকু মুখ (TMC Young Candidates 2026)
বর্তমানের রাজনীতি শুধু আর মিটিং-মিছিলে সীমাবদ্ধ নেই, তার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হয় সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। তৃণমূলের তরুণ প্রার্থীদের তালিকায় সেই ডিজিটাল দুনিয়ার এক অতি পরিচিত মুখ হলেন দেবাংশু ভট্টাচার্য।
বিধানসভা কেন্দ্র ও বয়স: আনুমানিক ২৯ থেকে ৩০ বছর বয়সী দেবাংশুকে এবার হুগলির চুঁচুড়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হয়েছে। তিনি দলের সবচেয়ে তরুণ প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম।
রাজনীতিতে প্রবেশ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা: দেবাংশু মূলত তৃণমূলের আইটি সেল ও সোশ্যাল মিডিয়ার রাজ্য সভাপতি হিসেবে কাজ করে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র দেবাংশু চিরাচরিত রাজপথের থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ও টেলিভিশন বিতর্কের মাধ্যমেই তাঁর মূল রাজনৈতিক উত্থান ঘটিয়েছেন। দলের হয়ে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে জোরালো সওয়াল করার সুবাদে তিনি আজ রাজ্য রাজনীতিতে এক অতি পরিচিত নাম। এবারই প্রথম তিনি ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিন ছেড়ে সরাসরি বিধানসভা ভোটে জনপ্রতিনিধি হিসেবে ময়দানে নেমেছেন।
অন্যদিকে, ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এক পোড়খাওয়া নাম হলো তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য।
বিধানসভা কেন্দ্র ও বয়স: আনুমানিক ৩১-৩২ বছর বয়সী তৃণাঙ্কুর এবার উত্তর ২৪ পরগনার নোয়াপাড়া কেন্দ্র থেকে লড়াই করছেন।
রাজনীতিতে প্রবেশ ও লড়াই: তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (TMCP) রাজ্য সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের ছাত্র আন্দোলন থেকে ধীরে ধীরে মূল স্রোতের রাজনীতিতে তাঁর এই উত্তরণ যথেষ্ট অনুপ্রেরণাদায়ক। নোয়াপাড়ায় তাঁকে এক কঠিন লড়াইয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে দল, কারণ সেখানে তাঁর প্রতিপক্ষ বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী অর্জুন সিং। অভিজ্ঞ বনাম তারুণ্যের এই লড়াই এবার নোয়াপাড়ায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের মশাল যাঁদের হাতে (TMC Young Candidates 2026)
রাজনীতিতে পরিবারের ঐতিহ্য বা উত্তরাধিকার একটি সাধারণ বিষয় হলেও, সেই জুতোয় পা গলিয়ে মানুষের মন জয় করা মোটেই সহজ কাজ নয়। এবারের তৃণমূলের তালিকায় এমন বেশ কয়েকজন তরুণ মুখ রয়েছেন, যাঁরা তাঁদের বাবা বা পরিবারের রেখে যাওয়া রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান।
শ্রেয়া পাণ্ডে (মানিকতলা): কলকাতার কেন্দ্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে তরুণ প্রার্থী হলেন শ্রেয়া পাণ্ডে (আনুমানিক ৩৩-৩৫ বছর)। তিনি রাজ্যের প্রয়াত প্রবীণ মন্ত্রী ও বর্ষীয়ান নেতা সাধন পাণ্ডের মেয়ে। পেশাগতভাবে অন্য জগতের মানুষ হলেও, বাবার অসুস্থতার সময় এবং তাঁর মৃত্যুর পর মানিকতলা এলাকায় বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং জনসংযোগের দায়িত্ব শ্রেয়া নিজের কাঁধে তুলে নেন। মূলত মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর সেই সূত্র ধরেই এবার দলের টিকিট পেয়ে সরাসরি মূল স্রোতের নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ।
শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (উত্তরপাড়া): হুগলির উত্তরপাড়া কেন্দ্র থেকে এবার প্রার্থী হয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ সাংসদ ও স্বনামধন্য আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে। পেশায় শীর্ষণ্য নিজেও কলকাতা হাইকোর্টের একজন সফল আইনজীবী। পারিবারিক রাজনৈতিক আবহ, আইনি জ্ঞান এবং বাবার দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে রেখেই এবার তিনি সরাসরি ভোট রাজনীতিতে পা রেখেছেন।
বসুন্ধরা গোস্বামী (পূর্বস্থলী উত্তর): তিরিশের কোঠায় থাকা বসুন্ধরা গোস্বামীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি একটু ভিন্ন। তিনি রাজ্যের প্রাক্তন প্রয়াত বামপন্থী মন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামীর কন্যা। বাবার মৃত্যুর বেশ কিছু সময় পর তিনি বামপন্থা ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। প্রথমদিকে সেভাবে প্রচারের আলোয় না থাকলেও, দলের অন্দরে নীরবে কাজ করার পর এবার তাঁকে প্রথমবার সরাসরি বিধানসভা নির্বাচনের টিকিট দিয়ে পূর্বস্থলী উত্তর থেকে প্রার্থী করা হয়েছে।
পেশাদারিত্ব ও নতুন প্রজন্মের ডিজিটাল চমক
সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষদের রাজনীতিতে আনার একটি চল বরাবরই দেখা যায়। এবারের তৃণমূলের তালিকায় পেশাদারিত্ব এবং ডিজিটাল প্রজন্মের এক সুন্দর মেলবন্ধন চোখে পড়েছে।
ডা. রাজীব বিশ্বাস (হারিংহাটা – SC): নদিয়ার হারিংহাটা কেন্দ্র থেকে দল এবার টিকিট দিয়েছে মাত্র ২৯ বছর বয়সী এক চিকিৎসককে। ডা. রাজীব বিশ্বাস পেশায় একজন ডাক্তার হয়েও মানুষের সেবায় নিজেকে আরও বৃহত্তর পরিসরে যুক্ত করার জন্য চাকরি ছেড়ে সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। কোনো পূর্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই দলের যুব ও পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। তৃণমূলের পেশাদার ও প্রথমবারের প্রার্থীদের প্রতি যে বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে, এটি তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
ঋতুপর্ণা আঢ্য (বনগাঁ দক্ষিণ – SC): মাত্র ২৬ থেকে ২৮ বছর বয়সী ঋতুপর্ণা এই তালিকার আরেক বড় চমক। তিনি বনগাঁ পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান শঙ্কর আঢ্যর মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির পরিবেশে বড় হলেও, তাঁর মূল পরিচিতি একজন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে। বনগাঁ পুরসভার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই মানুষের জন্য কাজ করছেন। স্থানীয় রাজনীতি ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে তিনি যেভাবে মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছেন, তা এক নতুন প্রজন্মের রাজনীতির কথাই বলে।
এঁদের পাশাপাশি তৃণমূলের এই যুব ব্রিগেডে রয়েছেন সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মতো মুখ। সায়ন্তিকা যেমন গ্ল্যামার জগতের গণ্ডি পেরিয়ে দলের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে দলকে আরও মজবুত করছেন।
ভবিষ্যতের বাংলা কার হাতে? (TMC Young Candidates 2026)
এইবারের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের এই প্রার্থী তালিকা শুধু একটি কাগজ নয়, এটি ভবিষ্যতের একটি ব্লু-প্রিন্ট। একদিকে প্রবীণ নেতাদের ওপর ভরসা রাখা হয়েছে, অন্যদিকে এই তরুণ মুখদের সামনে এনে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে একটি ভারসাম্য বা ‘জেনারেশন ব্যালান্স’ তৈরি করার সুস্পষ্ট চেষ্টা করা হয়েছে। দেবাংশুর ডিজিটাল ক্ষিপ্রতা, তৃণাঙ্কুরের রাজপথের অভিজ্ঞতা, ডা. রাজীবের পেশাদারিত্ব এবং শ্রেয়া বা শীর্ষণ্যের উত্তরাধিকার—সব মিলিয়ে তৃণমূলের এই নবীন প্রজন্ম কি পারবে বাংলার মানুষের মন জয় করতে? ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনই দেবে সেই প্রশ্নের উত্তর।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- দিনের ২৪ ঘণ্টা বদলে দিতে পারে আপনার জীবন! জানুন, সময় ব্যবহারের এই সহজ কৌশল
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- শালিমার বাগের ভবিষ্যৎ রহস্য: প্রেম, স্মৃতি আর সময়কে ছাপিয়ে ভবিষ্যৎ কি বদলে দেবে ইতিহাস?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- গ্যাস সিলিন্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যায়? এই ৬টি সহজ টিপস জানলে সিলিন্ডার

