Vintage & Classic Car Rally Kolkata: ভিন্টেজ গাড়ি মানেই শুধু শখ নয়, বরং ইতিহাস সংরক্ষণের এক নীরব দায়িত্ব। আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে যেখানে পুরনো যন্ত্রপাতি দ্রুত অচল হয়ে পড়ে, সেখানে কিছু মানুষ আজও বিশ্বাস করেন, যত্ন আর ধৈর্যের শক্তিতে অতীতকে বর্তমানের রাস্তায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একটি ভিন্টেজ গাড়ির পুনরুদ্ধার মানে শুধুমাত্র যান্ত্রিক মেরামতি নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্মৃতি, সময় এবং মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ। দিনের পর দিন পরিশ্রম, সঠিক যন্ত্রাংশের খোঁজ এবং মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা—সব মিলিয়ে এই প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব সংগ্রাম।
কলকাতা শহর এমন এক জায়গা, যেখানে সময় কখনও সোজা পথে হাঁটে না। কোনও কোনও সকালে সে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়, আবার কোনও কোনও দিনে উল্টো দিকে ঘুরে যায়। ১১ জানুয়ারির সেই সকালটিও ঠিক তেমনই ছিল। হেস্টিংসের দিক থেকে যখন একে একে বেরোতে শুরু করল ঝকঝকে অথচ শতবর্ষী গাড়িগুলো, তখন শহরের রাস্তাগুলো আর শুধুই রাস্তা রইল না—তারা হয়ে উঠল স্মৃতির করিডর।
লোহার শরীরে জমে থাকা বছরের পর বছর ইতিহাস, স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখা মানুষের চোখে বিশ্বাস আর ভালোবাসা—সব মিলিয়ে যেন কলকাতা নিজেই নিজের পুরনো অ্যালবাম খুলে বসেছে। কেউ দেখছে ১৯১৩ সালের গাড়ি, কেউ চিনে নিচ্ছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতি, আবার কেউ বা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবছে—এত বছর পরেও কীভাবে এই গাড়িগুলো আজও চলে?
আরও পড়ুন : স্থূলতার ফাঁদে বন্দি শহর: যেখানে নিঃশ্বাস নেওয়াও যেন এক ওজনদার লড়াই
এই গল্প শুধু একটি ভিন্টেজ কার র্যালির নয়। এই গল্প সেই মানুষগুলোর, যারা বিশ্বাস করেন—পুরনো মানেই ফেলে দেওয়ার নয়। যত্ন নিলে, সময় দিলেই, অতীত আবার বর্তমানের রাস্তায় ফিরে আসতে পারে। কলকাতার রাজপথে সেই দিন ঠিক সেটাই ঘটেছিল—ইতিহাস চলছিল, আর শহর নীরবে তাকিয়ে ছিল।
সকালের কলকাতা। জানুয়ারির নরম রোদ, শহরের চেনা কোলাহলের মাঝেই আচমকা যেন সময় পিছিয়ে গেল এক শতাব্দী। হেস্টিংসের রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব (RCTC) পোলো গ্রাউন্ড থেকে যখন একে একে বেরোতে শুরু করল ঝকঝকে অথচ বয়সে প্রাচীন গাড়িগুলো, তখন বোঝাই যাচ্ছিল—এটা নিছক কোনও র্যালি নয়, এ এক আবেগ, এক ইতিহাস, এক চলমান যাদুঘর। ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হল ভারতের প্রাচীনতম ভিন্টেজ অটোমোবাইল ইভেন্টগুলোর একটি— স্টেটসম্যানের উদ্যোগে পুরনো যে গাড়িগুলি আবার শহরের রাস্তায় দেখা গেল, যার ৫৫তম সংস্করণ আবারও প্রমাণ করল, কলকাতা শুধু সংস্কৃতির শহর নয়, ঐতিহ্য সংরক্ষণের শহরও।
প্রায় ১৬০টি ভিন্টেজ ও ক্লাসিক চারচাকা এবং ৫০টি মোটরসাইকেল ও স্কুটার—মোট প্রায় ২১০টি ঐতিহাসিক যান অংশ নেয় এই র্যালিতে। শোভাবাজার থেকে গ্রে স্ট্রিট, হরিশ মুখার্জি রোড—শহরের পরিচিত ল্যান্ডমার্ক ছুঁয়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এই যাত্রা। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি-ইন-সি লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাম চন্দর তিওয়ারির ফ্ল্যাগ-অফের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ইতিহাসের এই চাকা ঘোরার গল্প। পাঠকের জন্য এই প্রতিবেদনে রয়েছে র্যালির অন্দরমহল, বিরল গাড়ির গল্প, সংস্কৃতির ছোঁয়া এবং সেই সঙ্গে এক আধুনিক কলকাতাবাসীর—অনিরুদ্ধ ঘোষের—ভিন্টেজ গাড়ির প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাসের কাহিনি।

আয়োজন, রুট ও অংশগ্রহণ
কলকাতার বুকেই বছরের পর বছর ধরে এই র্যালি প্রমাণ করেছে, ভিন্টেজ মানেই শুধু পুরনো নয়—ভিন্টেজ মানে যত্ন, ইতিহাস আর দায়িত্ব। RCTC পোলো গ্রাউন্ডে সকাল থেকেই ভিড় জমাতে শুরু করেন দর্শকরা। কেউ ক্যামেরা হাতে, কেউ বা সন্তানকে নিয়ে—সবার চোখেই কৌতূহল। প্রায় ৩০ কিলোমিটারের রুট এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে শহরের ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলোর সঙ্গে গাড়িগুলোর ইতিহাস যেন একে অপরের সঙ্গে কথা বলে।
এই বছর অংশগ্রহণকারী যানবাহনের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। শুধু গাড়ি নয়, ক্লাসিক মোটরসাইকেল ও স্কুটারও আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। ইঞ্জিনের শব্দ, হর্নের টোন—সব মিলিয়ে আধুনিক গাড়ির একঘেয়ে শব্দের ভিড়ে যেন এক সুরেলা ব্যতিক্রম। এই র্যালির সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই—এটি প্রতিযোগিতার থেকেও বেশি এক উদযাপন, যেখানে অংশগ্রহণই আসল পুরস্কার।
বিরল গাড়ি ও কিংবদন্তি সংযোগ │ ১৯১৩ থেকে ১৯৪৮-এর ইতিহাস
এই বছরের র্যালিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে ছিল আনন্দ চৌধুরীর মালিকানাধীন ১৯১৩ সালের একটি গাড়ি ‘জেব্রুডার স্টোয়ার’ (Gebrüder Stoewer)—যা ছিল এই আসরের সবচেয়ে প্রাচীন বাহন। জার্মান কারিগরি দক্ষতার একেবারে শুরুর যুগের এই নিদর্শন আজও সচল অবস্থায় রাস্তায় নামতে পেরেছে—এই ঘটনাই দর্শকদের বিস্মিত করেছে। শতাব্দী পেরিয়ে যাওয়া ধাতব শরীর, অথচ এখনও দৃঢ় ও নির্ভরযোগ্য—এই গাড়ি যেন নিজেই ইতিহাসের জীবন্ত প্রমাণ।

এর ঠিক পাশেই আবেগের অন্য এক স্তরে দর্শকদের ছুঁয়ে যায় নীল রঙের ১৯৪৮ সালের একটি গাড়ি নীল রঙের ‘প্লাইমাউথ স্পেশাল ডিলাক্স’ (Nilu), যা একসময় কিংবদন্তি গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল। অনেকেই সেখানে ভিড় করেন শুধু একটি গাড়ি দেখার জন্য নয়, বরং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করার আশায়। গাড়িটির চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের চোখে ছিল এক ধরনের নীরব শ্রদ্ধা—যেন গান আর যান্ত্রিক ইতিহাস এক বিন্দুতে মিলেছে।

এই র্যালিতে আরও উপস্থিত ছিল ১৯২৮ সালের একটি রাজকীয় লিমুজিন, যা একসময় ক্ষমতা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। পাশাপাশি ছিল ১৯৩৭ সালের একটি অভিজাত গাড়ি ‘রোলস রয়েস ফ্যান্টম III’ (সাবেক ভাইস-রিগাল কার), যা অতীতে ভাইসরয়ের ব্যবহৃত বাহন হিসেবে পরিচিত—এর উপস্থিতি মানেই ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক ইতিহাসের ভার বহন করা। দুই চাকার বিভাগেও কম আকর্ষণ ছিল না। ১৯২৩ সালের একটি বিরল মোটরসাইকেল দর্শকদের বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, যা আজকের দিনে কার্যত বিলুপ্তপ্রায় এবং শুধুমাত্র সংগ্রাহকদের কাছেই দেখা যায়।
এই র্যালির আরেকটি বড় আকর্ষণ অংশগ্রহণকারীদের পোশাক। অনেকেই ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের স্যুট, হ্যাট বা গাউন পরে এসেছিলেন। মহিলাদের পরনে ছিল তন্ত ও জামদানি শাড়ি—যেন গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে মানুষগুলিও ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছেন। টলিউড অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তাঁর আসন্ন ছবি ‘বিজয়নগরের হিরে’-র টিমের সঙ্গে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানে আলাদা মাত্রা যোগ করেন।
বিকেল ৩টের সময় গাড়ির বিশুদ্ধতা (authenticity), পুনরুদ্ধারের মান এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিচার করে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। কিন্তু এখানে জেতা-হারার চেয়ে বড় ছিল স্বীকৃতি—পুরনোকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখার স্বীকৃতি।
কলকাতার বাসিন্দা অনিরুদ্ধ ঘোষ পেশায় টেলিভিশন পেশাদার। ভিন্টেজ গাড়ি পুনরুদ্ধার তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ। পারিবারিক সূত্রে ছোটবেলা থেকেই এই অনুরাগ গড়ে ওঠে এবং ১৯৯৩ সালে পরিবারের প্রথম ভিন্টেজ গাড়ি কেনার মাধ্যমে তা বাস্তব রূপ পায়। অনিরুদ্ধ ঘোষের কাছে গাড়ি পুনরুদ্ধার শুধুমাত্র যান্ত্রিক মেরামতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত অফিসের কাজ শেষ করার পর তিনি দীর্ঘ সময় গ্যারেজে কাটান এবং প্রতিটি গাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দেন। নিজের সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি অন্যান্য পরিবারের ভিন্টেজ গাড়ি পুনরুদ্ধারের কাজও করেছেন। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে বহু বছর অচল অবস্থায় থাকা গাড়িকে সচল করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
তাঁর সংগ্রহে থাকা ১৯৪৯ সালের মরিস মাইনর একসময় বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে পরিবারের সবচেয়ে নিয়মিত ব্যবহৃত গাড়ি। এই গাড়িতেই তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

১৯৬১ সালের মার্সিডিজ বেঞ্জ ফিনটেইল (ডিজেল) তিনি কানপুরের এক বিক্রেতার কাছ থেকে সরাসরি না দেখেই সংগ্রহ করেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে কলকাতায় এটি একমাত্র সচল ফিনটেইল মডেল।
১৯৩৩ সালের উলসলি নাইন গাড়িটি বিহারের একটি আস্তাবলে প্রায় তিন দশক পড়ে থাকার পর পুনরুদ্ধার করা হয়। ভারতে এই মডেলটি অত্যন্ত বিরল বলে মনে করা হয়।
এছাড়াও তাঁর সংগ্রহে রয়েছে ১৯৩৫ সালের অস্টিন সেভেন এবং ১৯৬০ সালের অ্যাম্বাসাডর মার্ক ওয়ান, যা প্রথম মালিকের গাড়ি হওয়ায় ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
যারা মনে করছেন এই গাড়িগুলি স্বচক্ষে দেখার সাক্ষী থাকবেন , তাদের জন্য থাকছে সেই সুযোগ। ১৫ ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ আলিপুরে ভিন্টেজ গাড়ির এই ইভেন্ট আবার দেখা যাবে সকাল ১১ টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত।
Vintage & Classic Car Rally Kolkata শুধু একটি ইভেন্ট নয়; এটি একটি বার্তা। যেখানে দ্রুতগতির আধুনিকতার মাঝে ধীরে চলার সৌন্দর্য শেখায়। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ছুঁয়ে দেখার সুযোগ দেয়। আর অনিরুদ্ধ ঘোষদের মতো মানুষদের গল্প প্রমাণ করে—এই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন শুধু অতীতের নয়, বর্তমানেরও।
#VintageCarRally #KolkataHeritage #StatesmanRally #ClassicCars #VintageLove
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- Gen Z-এর প্রেমের নতুন শব্দভান্ডার জানেন? ভালোবাসার নতুন ব্যাকরণ শিখুন | Gen Z Love Trends 2026
- ব্যস্ত সকালে এই ৫টি Tiffin Recipe রাখুন রোজের তালিকায় | Easy Tiffin Recipes
- ঠাকুর, দেবতা, ভগবান ও ঈশ্বর কি একই? গুলিয়ে ফেলার আগে জেনে নিন আসল তফাৎ | God vs Deity Meaning in Bengali
- জানুন, ব্যক্তি সুভাষের অনন্য প্রেমকাহিনী: সুভাষ ও এমিলি
- গান্ধী বনাম নেতাজি—মূল পার্থক্যটা কোথায়? | Gandhi vs Netaji

