West Bengal Exit Poll 2026 | ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোট শেষ হতেই রাজ্য রাজনীতিতে জল্পনা তুঙ্গে। ৬টির মধ্যে ৫টি সমীক্ষাই বিজেপিকে এগিয়ে রাখলেও, গ্রাউন্ড জিরোর রিপোর্ট বলছে অন্য কথা। কোন ৭টি অব্যর্থ ফ্যাক্টরের ওপর ভর করে ফের নবান্ন দখলে রাখতে পারে ঘাসফুল শিবির? রইল বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: আজ ২৯ এপ্রিল, রাজ্যে দ্বিতীয় দফার হাই-ভোল্টেজ নির্বাচন সবেমাত্র সমাপ্ত হলো। প্রথম দফার মতোই দ্বিতীয় দফাতেও নজিরবিহীন ভোটদানের হার প্রত্যক্ষ করল পশ্চিমবঙ্গ। প্রথম দফায় ভোট পড়েছিল প্রায় ৯৩.১৯ শতাংশ, আর দ্বিতীয় দফাতেও সেই ট্রেন্ড বজায় রেখে সকাল থেকেই বুথে বুথে মানুষের ঢল নেমেছিল। রাজনৈতিক মহলে একটি প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব হলো— রেকর্ড পরিমাণ ভোটদান সাধারণত প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার (Anti-incumbency) ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, শাসকদলের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে মানুষ বদলের আশায় বেশি করে ভোট দিতে বের হন। এই তত্ত্বকে হাতিয়ার করেই এবার বাংলায় ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখছে গেরুয়া শিবির। কিন্তু এই বিপুল ভোটদান কি সত্যিই শাসকদলের বিরুদ্ধে? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘প্রো-ইনকাম্বেন্সি’ বা সরকারের পক্ষে জনসমর্থনের নীরব স্রোত?
ভোটের এই মাঝপথেই বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যম এবং সমীক্ষক সংস্থাগুলির তরফ থেকে যে অভ্যন্তরীণ ‘বুথ ফেরত সমীক্ষা’ বা এক্সিট পোলের (Exit Poll) প্রাথমিক ট্রেন্ড সামনে আসছে, তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। জানা যাচ্ছে, দেশের প্রথম সারির ৬টি সমীক্ষক সংস্থার মধ্যে ৫টি সংস্থাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এবার বাংলায় পদ্ম ফুটতে চলেছে। তাদের দাবি, আরজি কর কাণ্ড, সন্দেশখালি, দুর্নীতি এবং টানা ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার জেরে তৃণমূলের পতন নিশ্চিত। কিন্তু রাজনীতি অঙ্কের সরল হিসাব নয়। গ্রাউন্ড জিরোর বাস্তব পরিস্থিতি, বুথ স্তরের খবর এবং বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক সমীকরণকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ একটি বিপরীত চিত্র উঠে আসে। এমন বেশ কিছু অকাট্য ফ্যাক্টর রয়েছে, যা এই সমস্ত এক্সিট পোলকে সম্পূর্ণ মিথ্যে প্রমাণ করে তৃণমূল কংগ্রেসকে চতুর্থবারের জন্য নবান্নের দখল এনে দিতে পারে।
এক্সিট পোল কী বলছে এবং বিজেপির পক্ষে কোন কোন ফ্যাক্টর কাজ করছে?
৬টির মধ্যে ৫টি সমীক্ষা বিজেপিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি আসন দিচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে কয়েকটি বিষয়। প্রথমত, আরজি কর হাসপাতালের নৃশংস ঘটনা রাজ্যে নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে শাসকদলকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে। দ্বিতীয়ত, সন্দেশখালিতে জমি দখল ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ। তৃতীয়ত, ইডি-সিবিআইয়ের লাগাতার হানা এবং রেশন, শিক্ষা থেকে শুরু করে একাধিক ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ। বিজেপির দাবি, এই ইস্যুগুলি শহুরে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি, রাম মন্দির এবং হিন্দুত্ববাদের হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে মেরুকরণের রাজনীতিতেও বিজেপি অনেকটা সফল বলে মনে করছেন সমীক্ষকরা।
প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফাতেও পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা যে ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে ভোটদান করেছেন, তার প্রমাণ মিলেছে ভোটের শতাংশেই। সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় ভোট পড়েছে প্রায় ৯২.৫০ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। জেলার নিরিখে দেখা যাচ্ছে, পূর্ব বর্ধমানে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে, আর তুলনামূলকভাবে কম ভোট পড়েছে দক্ষিণ কলকাতায়।
অন্যদিকে, প্রথম দফার ভোটেও একই ছবি দেখা গিয়েছিল। মুর্শিদাবাদের রানীনগরে প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোটদান হয়েছিল, যা কার্যত রেকর্ড গড়ে। গত কয়েক দশকে পশ্চিমবঙ্গে এত উচ্চ হারে ভোট পড়ার নজির খুবই বিরল।
এই বিপুল ভোটদানের প্রবণতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, সাধারণত এত বেশি শতাংশে ভোট পড়া মানেই ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষের ভোটদানে অংশগ্রহণ সেই ইঙ্গিতকেই আরও জোরদার করছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেরই ধারণা, এই উচ্চ ভোটের হার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং সেই সূত্রে বিজেপির ভালো ফল করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। তবে চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হবে ফল ঘোষণার দিনই।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে একাধিক সংস্থার এক্সিট পোল। মোট ছয়টি সংস্থা তাদের সমীক্ষার ফল প্রকাশ করেছে, আর সেই ফলাফলে উঠে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র।
চাণক্য স্ট্র্যাটেজিস জানাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ১৩০ থেকে ১৪০টি আসন। অন্যদিকে বিজেপির ঝুলিতে যেতে পারে ১৫০ থেকে ১৬০টি আসন। অন্যান্যরা পেতে পারে ৬ থেকে ১০টি আসন।
পিপলস পালস একমাত্র সংস্থা যারা তৃণমূলের বড় জয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। তাদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ১৭৮ থেকে ১৮ ৯টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ৯৫ থেকে ১১০টি আসন এবং অন্যান্যরা পেতে পারে ১ থেকে ৪টি আসন।
ম্যাট্রিজ-এর সমীক্ষা ছিল প্রথমদিকের এবং তা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ১২৫ থেকে ১৪০টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ১৪৬ থেকে ১৬১টি আসন এবং অন্যান্যরা পেতে পারে ৬ থেকে ১০টি আসন।
পি মার্ক জানাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ১১৮-১৩৮টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ১৫০ থেকে ১৭৫টি আসন এবং অন্যান্যরা পেতে পারে ২ থেকে ৫টি আসন।
প্রজা পোল-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ৮৫ থেকে ১১০টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ১৭৮ থেকে ২০৮টি আসন এবং অন্যান্যরা পেতে পারে ০ থেকে ৫টি আসন।
পোল ডায়রি জানাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ৯৯ থেকে ১২৭টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ১৪২ থেকে ১৭১ টি আসন এবং অন্যান্যরা পেতে পারে ৫ থেকে ৯টি আসন।
যে ৭টি ফ্যাক্টরে এক্সিট পোল মিথ্যে প্রমাণ করে ফের সরকার গড়তে পারে তৃণমূল:
১. মহিলা ভোটব্যাঙ্ক এবং লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ‘ম্যাজিক’:
টিভি স্টুডিও বা শহরের রাজপথে আরজি কর নিয়ে যতই আন্দোলন হোক না কেন, গ্রামীণ বাংলার মহিলাদের মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প বাংলার রাজনীতিতে একটি গেম-চেঞ্জার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি মাসে হাতখরচ পাওয়া গ্রামীণ মহিলাদের কাছে একটি বিরাট অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর মতো প্রকল্প। সমীক্ষকরা অনেক সময়ই এই নীরব মহিলা ভোটারদের (Silent Women Voters) মন পড়তে ব্যর্থ হন। বাংলার প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোটার হলেন মহিলা। বিজেপি যতই নারী নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলুক, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী কোটি কোটি মহিলা শেষ পর্যন্ত ‘দিদি’-র পাশেই দাঁড়াবেন বলে তৃণমূলের দৃঢ় বিশ্বাস। এই একটি মাত্র প্রকল্প একাই বিরোধীদের সমস্ত প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়াকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
২. সংখ্যালঘু ভোটের নিরঙ্কুশ মেরুকরণ:
পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন, যা যেকোনো নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করে। লোকসভা ভোটের আগে সিএএ (CAA) কার্যকর হওয়া এবং বিজেপির আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী প্রচার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি অস্তিত্ব রক্ষার আতঙ্ক তৈরি করেছে। অতীতে দেখা গিয়েছে, যখনই বিজেপির উত্থান হয়েছে, সংখ্যালঘুরা বাম-কংগ্রেসের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে একজোট হয়ে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। এই নির্বাচনেও বাম-কংগ্রেস বা আইএসএফ (ISF) যতই সংখ্যালঘু ভোটের দাবিদার হোক না কেন, ‘বিজেপিকে রুখতে পারে একমাত্র তৃণমূল’— এই মানসিকতা থেকে সংখ্যালঘুদের ঢালাও ভোট ঘাসফুল শিবিরেই পড়বে। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর, এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলোতে এই ফ্যাক্টর তৃণমূলকে একচেটিয়া আসন এনে দেবে।
৩. তৃণমূলের দুর্ধর্ষ ‘মাইক্রো-লেভেল’ বুথ ম্যানেজমেন্ট:
ভোটের দিন সকালবেলা ভোটারদের বাড়ি থেকে বের করে বুথ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার যে সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক তৃণমূলের রয়েছে, তা বিজেপির কাছে আজও অধরা। তৃণমূলের বুথ কমিটি, পাড়ার ক্লাব, এবং স্থানীয় নেতৃত্বের যে বিশাল সাংগঠনিক পরিকাঠামো রয়েছে, তা যেকোনো বিরোধী দলের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ভবানীপুরে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাস্তায় নেমে পড়া এবং বুথ পরিদর্শন প্রমাণ করে যে শাসকদলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে নিচুতলার কর্মী পর্যন্ত বুথ ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে কতটা তৎপর। কেন্দ্রীয় বাহিনী যতই কড়াকড়ি করুক, স্থানীয় স্তরে জনসংযোগ এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে তৃণমূলের এই সাংগঠনিক শক্তির সামনে বিজেপির ‘হাওয়া’ মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
৪. ‘ব্র্যান্ড মমতা’ এবং তাঁর স্ট্রিট-ফাইটার ইমেজ:
টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং গ্রহণযোগ্যতা অমলিন। তিনি আজও বাংলার মানুষের কাছে ‘ঘরের মেয়ে’। বিরোধীরা যতই দুর্নীতি বা ব্যর্থতার অভিযোগ আনুক, মমতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত স্তরে কোনো দুর্নীতির দাগ তারা প্রমাণ করতে পারেনি। ভোটের দিন সারারাত না ঘুমিয়ে, সকালবেলা রাস্তায় নেমে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই করার যে ছবি মানুষ দেখছে, তা তাঁর ‘স্ট্রিট-ফাইটার’ ইমেজকে আরও মজবুত করে। মানুষ মনে করে, একমাত্র মমতাই দিল্লির শক্তির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারেন। এই আবেগ এবং তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের অন্ধ ভক্তি অনেক নেতিবাচক ফ্যাক্টরকে ধামাচাপা দিয়ে দেয়।
৫. গ্রামীণ বাংলার সমর্থন এবং কৃষকদের ভোট:
মিডিয়ার ফোকাস সবসময় কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী শহুরে এলাকার দিকে থাকে। আরজি কর বা নিয়োগ দুর্নীতির ক্ষোভ মূলত শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাংলার বিধানসভা আসনের প্রায় ৭০ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। গ্রামীণ বাংলায় কৃষকদের জন্য ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্প, বিনামূল্যে রেশন, গ্রামীণ রাস্তার উন্নয়ন এবং সাইকেল বিতরণের মতো বিষয়গুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অনেক বেশি প্রভাবিত করে। শহুরে ক্ষোভকে মিডিয়া যতটা বড় করে দেখায়, গ্রামের বাস্তব চিত্র তার থেকে অনেকটাই আলাদা। গ্রামীণ ভোটাররা মূলত সরকারের দেওয়া দৈনন্দিন সুবিধার নিরিখেই ভোট দেন, আর সেই জায়গায় তৃণমূল বিরোধীদের থেকে যোজন মাইল এগিয়ে।
৬. বিরোধী ভোটের বিভাজন (বাম-কংগ্রেস ফ্যাক্টর):
এক্সিট পোলগুলো অনেক সময় ধরে নেয় যে শাসকদলের বিরোধী সমস্ত ভোট বিজেপির বাক্সে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। রাজ্যে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের জোট একটি নির্দিষ্ট শতাংশ ভোট নিজেদের দিকে টানবে। এই ভোটগুলি মূলত ধর্মনিরপেক্ষ, সরকার-বিরোধী ভোট, যা বাম-কংগ্রেস না থাকলে হয়তো বিজেপির দিকেই যেত। বাম-কংগ্রেস যদি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভোটও কাটে, তবে তা সরাসরি বিজেপির জয়ের সমীকরণকে বিগড়ে দেবে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে থাকা ক্ষোভের ভোট যদি বিজেপি এবং বাম-কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তবে তৃণমূল তাদের নিজস্ব ৩০-৩৫ শতাংশ কোর ভোটব্যাঙ্কের জোরেই অনায়াসে বহু আসনে জয়লাভ করে বেরিয়ে যাবে।
৭. ‘বাংলা বনাম বহিরাগত’ তত্ত্ব এবং আঞ্চলিক সেন্টিমেন্ট:
তৃণমূল অত্যন্ত সুকৌশলে এই নির্বাচনকে ‘বাঙালির অস্মিতা বনাম দিল্লির আগ্রাসন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইডি-সিবিআইয়ের লাগাতার হানা, কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতিসক্রিয়তাকে তৃণমূল বাংলার ওপর বহিরাগতদের আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরেছে। “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়” স্লোগানের অন্তর্নিহিত আঞ্চলিকতাবাদ আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলার ভোটারদের একাংশ, বিশেষ করে বয়স্ক এবং আদ্যোপান্ত বাঙালি সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী মানুষজন, দিল্লির নেতাদের এসে বাংলার ওপর খবরদারি করাটা ভালোভাবে নেন না। এই আঞ্চলিক সেন্টিমেন্ট এক্সিট পোলের অঙ্কে সহজে ধরা পড়ে না, কিন্তু ইভিএমে তার বড়সড় প্রভাব পড়ে।
আরও পড়ুন: ভবানীপুর কি রাণীনগরকে ছাপিয়ে যাবে? পরিবর্তন না প্রত্যাবর্তন— কোন পথে এগোচ্ছে লড়াই?
আঞ্চলিক বিশ্লেষণে কোথায় তৃণমূলের বাজিমাত?
দক্ষিণ বঙ্গ এবং জঙ্গলমহলে তৃণমূলের আধিপত্য ভাঙা বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। গত লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহলে বিজেপি কিছুটা প্রভাব বিস্তার করলেও, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ এবং ‘দুয়ারে সরকার’-এর মাধ্যমে তৃণমূল সেখানে হারানো জমি অনেকটাই পুনরুদ্ধার করেছে। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গে বিজেপি শক্তিশালী হলেও, কোচবিহার বা আলিপুরদুয়ারে তৃণমূলের চা-সুন্দরী প্রকল্প এবং রাজবংশী সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে শাসকদল বেশ কিছু আসন ছিনিয়ে নিতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এক্সিট পোল অনেক সময়ই একটি নির্দিষ্ট ট্রেন্ড বা ‘ওয়েভ’ ধরে সমীক্ষা করে। কিন্তু বাংলার রাজনীতি অত্যন্ত জটিল এবং বহুস্তরীয়। এখানে জাতপাত, ধর্ম, স্থানীয় নেতৃত্ব, এবং সরকারি অনুদান— প্রতিটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এক্সিট পোল যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে বুঝতে হবে যে আরজি করের ক্ষোভ বা দুর্নীতির অভিযোগের চেয়েও সাধারণ মানুষের কাছে মাস পয়লায় অ্যাকাউন্টে ঢোকা হাজার টাকার গুরুত্ব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা অনেক বেশি শক্তিশালী। ২ মে ব্যালট বাক্স খুললেই প্রমাণ হয়ে যাবে, ৫টি এক্সিট পোলের ভবিষ্যদ্বাণী মিলল, নাকি তৃণমূলের এই ৭টি অব্যর্থ ফ্যাক্টর আরও একবার ইতিহাস তৈরি করল।
আপনার কী মনে হয়? এক্সিট পোলের ইঙ্গিত কি এবার সত্যি হবে, নাকি তৃণমূলের জনহিতকর প্রকল্পগুলোই শেষ কথা বলবে? আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না। রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে নিখুঁত ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ পেতে চোখ রাখুন NewsOffBeat-এ।

