নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: আজ মকর সংক্রান্তি। সকাল থেকেই আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের ‘শুভ মকর সংক্রান্তি’ বা ‘হ্যাপি পঙ্গল’ লিখে মেসেজ পাঠানোর ধুম পড়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম—সবর্ত্রই রঙিন ছবি আর জিআইএফ (GIF)-এর ছড়াছড়ি। কিন্তু এই আনন্দের আবহে আপনার অজান্তেই কি ফোনে ঢুকছে কোনো ভয়ানক বিপদ?
উৎসবের মরসুমে সাইবার প্রতারকরা নতুন ফাঁদ পেতেছে। একটি সাধারণ ‘শুভেচ্ছা বার্তা’ বা লিঙ্কে ক্লিক করলেই নিমেষে ফাঁকা হতে পারে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। কলকাতা পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সাইবার ক্রাইম বিভাগের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা অনুযায়ী, উৎসবের দিনগুলিতেই সবথেকে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে হ্যাকাররা।
আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা জানাচ্ছি উৎসবের আড়ালে চলা এমনই ৩টি বড় সাইবার জালিয়াতির কথা, যা থেকে সাবধান না হলে সর্বস্বান্ত হতে পারেন।
১. গ্রীটিং কার্ডের আড়ালে ‘পিঙ্ক হোয়াটসঅ্যাপ’ বা .apk ভাইরাস
তেলেঙ্গানা ও হায়দ্রাবাদ সাইবার পুলিশের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতারকরা এখন উৎসবের সুযোগ নেয়। আপনার হোয়াটসঅ্যাপে অপরিচিত নম্বর থেকে একটি লিঙ্ক আসতে পারে। সেখানে লেখা থাকতে পারে— “Makar Sankranti Special Gift for You” বা “Click to see the magic surprise”।
- বিপদ কোথায়: এই লিঙ্কে ক্লিক করলেই আপনার ফোনে একটি ম্যালিশাস অ্যাপ (.apk file) ডাউনলোড হয়ে যাবে। এটি দেখতে সাধারণ গ্রীটিং কার্ডের মতো মনে হলেও, ব্যাকগ্রাউন্ডে এটি আপনার ফোনের কন্ট্যাক্ট লিস্ট, গ্যালারি এবং ওটিপি (OTP)-র অ্যাক্সেস নিয়ে নেয়।
- কী করবেন: কোনো অচেনা নম্বর থেকে আসা লিঙ্কে ক্লিক করবেন না। বিশেষ করে যে লিঙ্কের শেষে
.apkবা.exeআছে, তা ভুলেও খুলবেন না।
২. ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর আতঙ্ক (Digital Arrest Scam)
সম্প্রতি দিল্লি ও কলকাতায় বয়স্ক দম্পতিদের টার্গেট করে এক নতুন ধরণের প্রতারণা শুরু হয়েছে, যার নাম ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’। উৎসবের দিনে বাড়িতে সবাই যখন রিল্যাক্সড মুডে থাকেন, তখনই ভিডিও কলে আসে হুমকি।
- কীভাবে ঘটে: প্রতারকরা পুলিশ, সিবিআই (CBI) বা ট্রাই (TRAI)-এর অফিসার সেজে ভিডিও কল করে। তারা দাবি করে, আপনার আধার কার্ড ব্যবহার করে বেআইনি কাজ হয়েছে বা পার্সেলে মাদক পাওয়া গেছে। এরপর তারা আপনাকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করে রাখে, অর্থাৎ ভিডিও কল কাটতে বারণ করে এবং ভয় দেখিয়ে টাকা ট্রান্সফার করতে বাধ্য করে।
- পুলিশের অ্যাডভাইজরি: কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘সাইবার দোস্ত’ (CyberDost) হ্যান্ডেল এবং কলকাতা পুলিশের সাইবার সেল স্পষ্ট জানিয়েছে— “ভারতীয় আইনে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ বলে কিছু হয় না।” পুলিশ বা সিবিআই কখনোই ভিডিও কলে জেরা করে টাকা চায় না। এমন ফোন এলে ঘাবড়ে না গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিন।
আরও পড়ুন : ফিরবে ভাগ্য! সংক্রান্তির সন্ধ্যায় চুপিসারে করুন এই ৩ কাজ
৩. ভুয়া লোন অ্যাপ ও মুখ্যমন্ত্রী/প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অফিসিয়াল এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে কিছুদিন আগেই একটি সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতারকরা ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করে ভুয়া লোনের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে।
- ফাঁদ: “সংক্রান্তি স্পেশাল লোন”, “বিনাসুদে লোন”—এমন লোভনীয় অফার দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। লিঙ্কে ক্লিক করলেই ফোনে স্পাইওয়্যার ইনস্টল হচ্ছে এবং আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হচ্ছে।
- সতর্কতা: কোনো সরকারি যোজনা বা লোন সোশ্যাল মিডিয়ার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেওয়া হয় না। সঠিক তথ্যের জন্য সবসময় অফিসিয়াল সরকারি ওয়েবসাইট (যাঁদের শেষে .gov.in আছে) ভিজিট করুন।
৪. গুগল সার্চে কাস্টমার কেয়ার নম্বর খোঁজা
উৎসবের ছুটিতে অনেক সময় পেমেন্ট ফেল হলে বা অনলাইন অর্ডারে সমস্যা হলে আমরা গুগলে কাস্টমার কেয়ার নম্বর খুঁজি। কলকাতা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গুগল ম্যাপ বা সার্চ রেজাল্টে প্রতারকরা নিজেদের নম্বর ‘কাস্টমার কেয়ার’ হিসেবে সেভ করে রাখে। সেই নম্বরে ফোন করলেই তারা আপনার ফোনে ‘AnyDesk’ বা ‘TeamViewer’-এর মতো রিমোট অ্যাক্সেস অ্যাপ ডাউনলোড করিয়ে নেয় এবং অ্যাকাউন্টের টাকা সাফ করে দেয়।
সাইবার প্রতারণার শিকার হলে কী করবেন?
যদি ভুলবশত কোনো লিঙ্কে ক্লিক করে ফেলেন বা প্রতারণার শিকার হন, তবে আতঙ্কিত না হয়ে নিচের পদক্ষেপগুলি নিন:
- গোল্ডেন আওয়ার (Golden Hour): প্রতারণা হওয়ার ১ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট করলে টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি থাকে।
- হেল্পলাইন নম্বর: সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সাইবার ক্রাইম হেল্পলাইন নম্বর ১৯৩০ (1930)-এ কল করুন।
- অনলাইন অভিযোগ: জাতীয় সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল [suspicious link removed]-এ অভিযোগ দায়ের করুন।
- কলকাতা পুলিশ: কলকাতার বাসিন্দারা কলকাতা পুলিশের সাইবার সেলে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন বা তাদের ফেসবুক পেজে রিপোর্ট করতে পারেন।
উৎসব মানেই আনন্দ, কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে সতর্কতাই আসল সুরক্ষা। আজকের দিনে হোয়াটসঅ্যাপে আসা ফরোয়ার্ডেড মেসেজ বা লোভনীয় লিঙ্কে ক্লিক করার আগে দুবার ভাবুন। আপনার একটু সচেতনতাই পারে আপনার কষ্টার্জিত অর্থ বাঁচাতে।
(তথ্যসূত্র: কলকাতা পুলিশ সাইবার সেল, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এক্স হ্যান্ডেল, CERT-In অ্যাডভাইজরি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সাইবার দোস্ত সতর্কবার্তা।)

