Writers Building: দীর্ঘ ১৩ বছর পর রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ফেরার প্রস্তুতি রাজ্য সচিবালয়ের। একাধিক দফতরের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে এই ঐতিহাসিক ভবনে। মুখ্যমন্ত্রীর দফতর-সহ বাকি দফতরগুলি কবে নবান্ন থেকে মহাকরণে ফিরবে, এখন নজর সেদিকেই।
দীর্ঘ ১৩ বছর পর আবারও রাজ্যের প্রশাসনের কেন্দ্র হতে চলেছে কি ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিং? ২০১৩ সালে নবান্নে সরে যাওয়ার পর ফের রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সচিবালয়ের কাজকর্ম ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের একাধিক অংশে সংস্কার ও প্রস্তুতির কাজ চলছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি দফতর সেখানে কাজ শুরু করেছে। তবে রাজ্যের সমস্ত দফতর কবে একসঙ্গে নবান্ন থেকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে চলে আসবে, সেই সময়সীমা এখনও স্পষ্ট নয়।
লালদিঘির ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক ভবন শুধু একটি প্রশাসনিক ভবন নয়, বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়—দীর্ঘ সময় ধরে এই ভবন থেকেই রাজ্যের প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হয়েছে।
রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ভিতরে এখন কী প্রস্তুতি?
রাইটার্স বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন অংশে বর্তমানে সংস্কার ও প্রস্তুতির কাজ চলছে। তৃতীয় তলায় মুখ্যমন্ত্রী ও কয়েকজন মন্ত্রীর জন্য কক্ষ প্রস্তুতের কাজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ের জন্যও আলাদা কক্ষ রাখার পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে।
সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, কিছু দফতরের ঠিকানা ইতিমধ্যেই রাইটার্স বিল্ডিংয়ে রয়েছে। আইন দফতরের ঠিকানা রাইটার্স বিল্ডিংয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতর এখনও নবান্নে রয়েছে।
অর্থাৎ, প্রশাসনের সব দফতর একসঙ্গে স্থানান্তরিত না হলেও রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সরকারি কাজকর্মের উপস্থিতি ইতিমধ্যেই রয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন, ভবিষ্যতে আরও কতগুলি দফতর সেখানে স্থানান্তরিত হবে এবং পুরো সচিবালয়ের কাজের কাঠামো কীভাবে সাজানো হবে।
যে ভবন থেকে চলেছে বাংলার প্রশাসন
রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ইতিহাস বহু পুরনো। ব্রিটিশ আমলে কলকাতা যখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল, তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মীদের কাজের জন্য এই ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ভবনটি বাংলার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পরও দীর্ঘদিন এই ভবন থেকেই রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হয়েছে। একের পর এক মুখ্যমন্ত্রী এই ভবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্লচন্দ্র সেন, অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য—একাধিক মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষী এই ভবন।
ঐতিহাসিক এই ভবনের সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনেরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বিপ্লবী বিনয়, বাদল ও দীনেশ রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করে কর্নেল সিম্পসনকে হত্যা করেন। সেই ঘটনার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বর্তমান বিবাদী বাগ এলাকার নামের ইতিহাসও।
২০১৩ সালে নবান্নে সরেছিল সচিবালয়
দীর্ঘদিন রাজ্য প্রশাসনের কেন্দ্র থাকার পর ২০১৩ সালে নবান্নে সচিবালয়ের কাজকর্ম স্থানান্তরিত হয়। হাওড়ার শিবপুরে অবস্থিত নবান্ন এরপর রাজ্যের প্রশাসনিক কাজের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালে নতুন সরকার গঠনের পর রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রশাসন ফিরিয়ে আনার আলোচনা শুরু হয়। মে মাসে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলার সংস্কার ও প্রস্তুতির কথা উঠে এসেছিল।
পরবর্তী সময়েও রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সংস্কার নিয়ে কাজ এগিয়েছে। ভবনের সংস্কারের একটি বড় অংশ শেষ করার লক্ষ্যে কাজ চলছে এবং তলায় মুখ্যমন্ত্রী ও কয়েকজন মন্ত্রীর জন্য কক্ষ প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তবে প্রশাসনের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে পরবর্তী সময়ে নতুন পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। আগস্টের একটি প্রতিবেদনে নতুন শহরে সব ৫৪টি দফতরকে নিয়ে নতুন প্রশাসনিক ভবন তৈরির পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। ফলে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সম্পূর্ণ সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়ে এখনও একাধিক পরিকল্পনা ও পরিবর্তনের খবর রয়েছে।
মহাকরণে ফিরলে বদলাবে প্রশাসনের ঠিকানা
রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রশাসনিক কাজ ফের শুরু হলে বদলে যাবে রাজ্য সরকারের কাজের পরিচিত ঠিকানা। লালদিঘির ধারের ঐতিহাসিক ভবন ফের একবার রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে।
ইতিমধ্যেই আইন দফতরের মতো কিছু দফতরের কাজ রাইটার্স বিল্ডিং থেকে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একই ভবনে আরও কিছু প্রশাসনিক দফতরের উপস্থিতিও রয়েছে।
তবে পুরো সচিবালয় রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ফিরবে কি না, ফিরলে কবে এবং কোন কোন দফতর প্রথমে যাবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও সম্পূর্ণভাবে স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পরিকল্পনাগুলিতে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সংস্কার, ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে একাধিক তথ্য সামনে এসেছে।
ইতিহাসের ভবনে ফিরছে কি প্রশাসনের ব্যস্ততা?
একসময় যে ভবন থেকে বাংলার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, বহু বছর পর সেই ভবনে আবার প্রশাসনিক ব্যস্ততা বাড়ছে। সংস্কারের কাজ, দফতর প্রস্তুত করা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির মধ্য দিয়ে রাইটার্স বিল্ডিংকে নতুন করে ব্যবহারের প্রক্রিয়া চলছে।
রাইটার্স বিল্ডিংয়ের করিডোর, কক্ষ এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার প্রশাসনের বহু দশকের স্মৃতি। তাই এই ভবনের ভবিষ্যৎ শুধু প্রশাসনিক স্থানান্তরের প্রশ্ন নয়, ঐতিহাসিক ভবনটির নতুন করে ব্যবহারের বিষয়ও।
এই মুহূর্তে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কিছু দফতর রাইটার্স বিল্ডিংয়ে রয়েছে, আবার বহু গুরুত্বপূর্ণ দফতর এখনও নবান্নসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবন থেকে কাজ করছে।

