Pangong Frozen Lake Marathon: পশ্চিম সীমান্তে যখন যুদ্ধের মেঘ ঘনাচ্ছে, ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগেই ১৪ হাজার ফুট উঁচুতে প্যাংগং লেকে আয়োজিত হলো ম্যারাথন। চরম উত্তেজনার আবহে ভারতের এই পদক্ষেপ কীভাবে ভূ-রাজনৈতিক শক্তি প্রমাণ করল?
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ভূ-রাজনীতির অঙ্ক বড়ই অদ্ভুত। কখনো কখনো একটি সাধারণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও হয়ে উঠতে পারে শক্তি প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার দিকে একবার চোখ রাখুন। ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাতে পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ ‘খোলা যুদ্ধ’ বা ওপেন ওয়ার। চারদিকে বারুদের গন্ধ, এয়ারস্ট্রাইক আর হাহাকার। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে, ভারতের উত্তর সীমান্তে কী ঘটছিল জানেন?
পশ্চিম সীমান্তে যখন যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে আসছিল, ঠিক সেই সময়ে, অর্থাৎ ২৪ এবং ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ভারত তার চিন সংলগ্ন সীমান্তে রচনা করছিল এক অন্য ইতিহাস। লাদাখের প্যাংগং লেকের জমে যাওয়া বরফের ওপর অনুষ্ঠিত হলো এক আন্তর্জাতিক ম্যারাথন। একদিকে প্রতিবেশী দেশে যখন ধ্বংসলীলার প্রস্তুতি চলছে, তখন ১৪ হাজার ফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে ভারত গোটা বিশ্বকে দিল শান্তি, সাহস এবং চরম স্থিতিশীলতার বার্তা।
Pangong Frozen Lake Marathon নামের এই অভূতপূর্ব ইভেন্ট শুধু একটি দৌড় প্রতিযোগিতা নয়, এটি ভারতের ভূ-রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত নিদর্শন। আসুন, গল্পের মতো করে বুঝে নিই বরফের ওপর এই দৌড় কেন ভারতের জন্য এক বিশাল ‘মাস্টারস্ট্রোক’।
শূন্যের নিচে তাপমাত্রা এবং অদম্য জেদ
প্যাংগং লেকের নাম শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে নীল জলরাশি এবং চারপাশের রুক্ষ পাহাড়ের ছবি। কিন্তু শীতকালে এই লেক তার রূপ পুরোপুরি বদলে ফেলে। হাড়হিম করা ঠান্ডায় পুরো লেকটি জমে বরফের এক বিশাল সাদা চাদরে পরিণত হয়। এই বছর, ২০২৬ সালের ২৪ এবং ২৫শে ফেব্রুয়ারি এই জমে যাওয়া লেকের ওপরেই অনুষ্ঠিত হলো ‘প্যাংগং ফ্রোজেন লেক ম্যারাথন’-এর চতুর্থ সংস্করণ।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪,০০০ ফুট উঁচুতে এই ম্যারাথনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানকার পরিবেশ সাধারণ মানুষের জন্য কতটা প্রতিকূল হতে পারে, তা হয়তো আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১৫ ডিগ্রি থেকে মাইনাস ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস! এই চরম হাড়হিম করা ঠান্ডা এবং পাতলা বাতাসের (thin air) মধ্যেই ৪৫০ জনেরও বেশি প্রতিযোগী বরফের বুক চিরে দৌড়েছেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৩ সালে যখন প্রথমবার এই ম্যারাথন শুরু হয়েছিল, তখন প্রতিযোগীর সংখ্যা যা ছিল, এই বছর তা প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু ভারতীয়রাই নন, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (UAE) এবং নেপালের মতো দেশ থেকেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীরা এই ভয়ংকর সুন্দর ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন।
ঝড়ের আগে ভারতের ‘সফট পাওয়ার’
এই ম্যারাথনটির আসল গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের টাইমলাইন এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি মেলাতে হবে। ২৬ তারিখ রাতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। তার ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে ভারতের এই সফল আয়োজন প্রমাণ করল যে, প্রতিবেশী দেশে যতই অস্থিরতা তৈরি হোক না কেন, ভারতের সীমানা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং শান্ত।
চিনের সঙ্গে লাদাখ সীমান্তে বিগত বছরগুলোতে যে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বা ফেস-অফ চলেছিল, এই ম্যারাথন আয়োজনের মাধ্যমে সেই অঞ্চলটিতে স্বাভাবিক অবস্থা বা নর্মালসি (normalise activities) ফিরিয়ে আনার একটি জোরালো বার্তা দেওয়া হলো।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের একটি অসাধারণ ‘সফট পাওয়ার’ (Soft Power) স্ট্র্যাটেজি। গ্লোবাল মিডিয়া যখন আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে জল্পনা করছিল, তখন তারা এটাও দেখল যে ভারতের দুর্গম সীমান্তে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদরা নিশ্চিন্তে দৌড়াচ্ছেন। গত বছর অক্টোবরে মিডিয়া রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল যে, প্যাংগং লেকের কাছে চিন একটি নতুন এয়ার-ডিফেন্স ফেসিলিটি তৈরি করছে। ঠিক সেই প্যাংগং লেকেই ভারতের এই বর্ণাঢ্য আয়োজন চিনের জন্য একটি নীরব অথচ স্পষ্ট সতর্কবার্তা—”আমরা আমাদের জমিতে যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত।”
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কোনো সাধারণ স্পোর্টস ক্লাবের পক্ষে একা আয়োজন করা সম্ভব ছিল না। ‘থিন আইস অ্যাডভেঞ্চারস’ (Thin Ice Adventures) নামের একটি সংস্থার আয়োজনে এবং লাদাখের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনের সহযোগিতায় এই ম্যারাথনটি সম্পন্ন হয়। তবে এর পেছনে সবচেয়ে বড় স্তম্ভ ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। ভারতীয় সেনার লাদাখ-ভিত্তিক ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি কর্পস’ এবং ‘ত্রিশূল ডিভিশন’ অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে এই ম্যারাথনে সমর্থন জুগিয়েছে। সেনাবাহিনীর মতে, এই আয়োজন লাদাখে উইন্টার স্পোর্টস বা শীতকালীন খেলাধুলার প্রসারে তাদের অবিচল প্রতিশ্রুতিরই প্রমাণ।
ম্যারাথনে ৫ কিলোমিটার থেকে শুরু করে ৪২ কিলোমিটারের ফুল ম্যারাথন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটেগরি ছিল। আর এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে উঠে এসেছেন ‘লাদাখ স্কাউটস’ (Ladakh Scouts)-এর জওয়ানরা। ১০ কিলোমিটার রেসে জয়ী হয়েছেন অগ্নিবীর মেহবুব আলি, ২১ কিলোমিটার হাফ-ম্যারাথনে প্রথম হয়েছেন রাইফেলম্যান সেতান নামগিয়াল, এবং ৪২ কিলোমিটারের কঠিন ফুল ম্যারাথনে বিজয়ীর মুকুট পরেছেন নায়েক সেরিং নুরবু। আমাদের জওয়ানরা যে শুধু অস্ত্র হাতে নয়, ক্রীড়াক্ষেত্রেও কতটা অদম্য, এই ফলাফল তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
বিজ্ঞান, নিরাপত্তা এবং বিশ্বরেকর্ড
১৪ হাজার ফুট উঁচুতে একটি জমে যাওয়া লেকের ওপর দিয়ে কয়েকশো মানুষের দৌড়ানো কি আদৌ নিরাপদ? এই প্রশ্নটা আপনার মনে আসতেই পারে। ভারত সরকারও এই বিষয়ে কোনো ফাঁক রাখেনি।
এই ম্যারাথনের আগে ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (NDRF) এবং লাদাখের নিজস্ব বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী লেকের বরফের স্তরের পুরুত্বের ওপর অত্যন্ত নিখুঁত ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ইন্সপেকশন চালিয়েছিল। রেস চলাকালীনও বরফের পুরুত্ব মাপা হচ্ছিল। ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-এর সহযোগিতায় বিগত ১৫ বছরের আবহাওয়ার ডেটা বিশ্লেষণ করে একটি বিজ্ঞানসম্মত মূল্যায়ন করা হয়েছিল। পরিবেশগত সুরক্ষা এবং ম্যারাথনের নিরাপদ এক্সিকিউশন নিশ্চিত করতেই এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।
সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয় হলো, এটি কোনো সাধারণ দৌড় নয়। প্রথমবার যখন এই ইভেন্টটি আয়োজিত হয়েছিল, তখনই এটি এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের উচ্চতম ফ্রোজেন-লেক ম্যারাথন হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস (Guinness World Records)-এ জায়গা করে নিয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্যাংগং লেকের চারপাশে উইন্টার ট্যুরিজম প্রোমোট করাই ছিল এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ বনাম বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ
ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে প্রতিটি মানুষের দাবি জানানোর অধিকার আছে। এই ম্যারাথন যখন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, তার কিছুদিন আগেই লাদাখে পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফশিল অন্তর্ভুক্তির দাবিতে একটি বড়সড় আন্দোলন হয়েছিল। গত বছর সেপ্টেম্বরে এই আন্দোলনে চারজনের মৃত্যুও হয়েছিল। এই সাম্প্রতিক উত্তেজনার পরেও এত ব্যাপক উদ্দীপনার সঙ্গে ম্যারাথনে মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের কাছে অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য অনেক ছোট।
রাজনৈতিক দিক থেকেও এই ইভেন্টটির একটি তাৎপর্য রয়েছে। বিরোধী নেতৃত্ব এর আগে প্যাংগং লেকে গিয়ে দাবি করেছিলেন যে চিন ভারতের জমি দখল করেছে। কিন্তু এই ম্যারাথনের বিপুল সাফল্য সেই জল্পনাগুলোতে জল ঢেলে দিয়েছে। আসামের এক বিজেপি নেতা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে জানিয়েছেন যে, সফলভাবে এই ম্যারাথন আয়োজনের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে চিনের কাছে জমি হারানোর দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
বিশ্ব এখন এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ২৬ তারিখ রাতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের যুদ্ধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, অস্থির রাজনীতি একটি অঞ্চলকে কীভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ঠিক সেই যুদ্ধের দামামা বাজার কয়েক ঘণ্টা আগে, ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় বরফের ওপর দৌড়ানো এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীরা ভারতের সেই শক্তির কথা বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন, যা কেবল অস্ত্রে নয়, বরং দেশের মানুষের আত্মবিশ্বাসে বিরাজ করে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো
#PangongFrozenLakeMarathon #LadakhTourism #IndianArmy #Geopolitics #IndiaChinaBorder

