Aajo Ardhangini Movie Review: অর্ধাঙ্গিনী-র আবেগঘন গল্পের পর নতুন অধ্যায় হিসেবে এসেছে আজও অর্ধাঙ্গিনী। সম্পর্ক, আত্মত্যাগ, সন্দেহ, ক্ষমা এবং নারীর আত্মমর্যাদার গল্পে সাজানো এই ছবিতে সিক্যুয়েলের প্রয়োজনীয়তা কতটা ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: একটা গল্প শেষ হয়ে গেলেই কি তার সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যায়? সব সম্পর্ক কি শেষ দৃশ্যের পরেই থেমে যায়? নাকি কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ব্যাখ্যা খুঁজে নেয়? পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর নতুন ছবি ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’-তে সেই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খুঁজেছেন। ২০২৩ সালের বহুল প্রশংসিত ছবি ‘অর্ধাঙ্গিনী’-র পরবর্তী অধ্যায় এই ছবি। তবে এটাকে শুধু সিক্যুয়েল বললে ভুল হবে। বরং আগের ছবির আবেগ, না বলা কথা, অপরাধবোধ, আত্মত্যাগ, সম্পর্কের জটিলতা এবং মানুষের মানসিক পরিণতির গল্পকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন পরিচালক।
ছবির শুরুতেই গানের মাধ্যমে ‘অর্ধাঙ্গিনী’-র গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো ফিরিয়ে আনা হয়। যারা আগের ছবি দেখেছেন, তাঁদের জন্য এটি স্মৃতিচারণের মতো কাজ করে। আর যারা অনেকদিন আগে ছবিটি দেখেছিলেন, তাঁদেরও গল্পের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত করে দেয় এই অংশ। তারপরই শুরু হয় ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’-র নতুন অধ্যায়।
অর্ধাঙ্গিনী থেকে আজও অর্ধাঙ্গিনী— কোথায় বদলাল গল্প?
প্রথম ছবির গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সুমন চট্টোপাধ্যায় (কৌশিক সেন), তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী শুভ্রা (চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়) এবং বর্তমান স্ত্রী মেঘনা (জয়া আহসান)।
শুভ্রা ছিলেন সুমনের সতেরো বছরের সংসারের সঙ্গী। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে সন্তান না হওয়ার জন্য সুমন সমস্ত দোষ চাপিয়ে দেন শুভ্রার উপর। অপমান, অবহেলা আর মানসিক যন্ত্রণার মধ্যেই ভেঙে যায় সেই সম্পর্ক। পরে জানা যায়, সন্তান না হওয়ার সমস্যাটি আসলে শুভ্রার নয়, বরং সুমনেরই ছিল। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
এরপর বাংলাদেশের রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মেঘনার প্রেমে পড়ে তাঁকে বিয়ে করেন সুমন। নতুন জীবন শুরু হলেও ভাগ্য অন্য গল্প লিখেছিল। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন সুমন। তখন নিজের সমস্ত অভিমান ভুলে তাঁকে বাঁচানোর লড়াইয়ে এগিয়ে আসেন শুভ্রা। সেই আবেগঘন মুহূর্তেই শেষ হয়েছিল ‘অর্ধাঙ্গিনী’।
এবার গল্পের কেন্দ্রে দুই নারী
‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’-তে পরিচালক খুব সচেতনভাবেই সুমনকে গল্পের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এবার ছবির আসল নায়ক আসলে দুই নারী— শুভ্রা এবং মেঘনা।
গল্পের শুরু হয় অম্বরীশ ভট্টাচার্যের চরিত্রের বিয়েকে ঘিরে। সেই বিয়ের সূত্রেই আবার একসঙ্গে আসেন শুভ্রা ও মেঘনা। একটি নতুন সমস্যার সূত্রপাত হয়, যা প্রথমে সাধারণ মনে হলেও ধীরে ধীরে গভীর মানসিক সংঘাতে পরিণত হয়।
বর্তমানে প্রত্যেকটি চরিত্র কোথায় দাঁড়িয়ে? কে কাকে ক্ষমা করেছে? কে এখনও অতীতের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে? আর কে নিজের জীবনকে নতুন করে সাজাতে চাইছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর ধীরে ধীরে খুঁজে পায় ছবির চিত্রনাট্য।
সম্পর্কের ভিত যদি মিথ্যার উপর দাঁড়ায়…
ছবি দেখতে দেখতে একটা বিষয় বারবার মনে হয়— মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হওয়া কোনও সম্পর্ক কি সত্যিই টিকে থাকতে পারে? পরিচালক খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন, সত্য গোপন করলে তার প্রভাব শুধু একজন মানুষের জীবনে পড়ে না, সেই ঢেউ বহু মানুষের জীবনকে নাড়া দেয়।
আরেকটি প্রশ্নও ছবি তুলে ধরে—
সন্দেহ বড়, না সত্য?
মানুষকে কোনটা বেশি কুরে কুরে খায়?
এই প্রশ্নের উত্তর ছবি একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধরে রাখে।
শুভ্রা— আর শুধু অর্ধাঙ্গিনী নন
এই ছবির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুভ্রা।
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় এমন সংযত অথচ শক্তিশালী অভিনয় করেছেন, যা বাংলা সিনেমার সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সেরা অভিনয়ের তালিকায় জায়গা পাবে। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় নিজেও বলেছেন, শুভ্রা আর আগের সেই ভেঙে পড়া নারী নন। তিনি এখন অনেক বেশি পরিণত।
পরিচালকের ভাষায়—
তিনি আর শুধু অর্ধাঙ্গিনী নন, তিনি আজ পূর্ণাঙ্গিনী।
এই একটি ভাবনাই ছবির দর্শনকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
অভিনয় নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় এই ছবির প্রাণ। বিশেষ করে অম্বরীশ ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর একটি ব্যক্তিগত আবেগঘন দৃশ্যে তিনি যেভাবে অভিনয় করেছেন, তা সত্যিই অসাধারণ। জয়া আহসান বরাবরের মতোই অত্যন্ত স্বাভাবিক। তাঁকে পর্দায় সুন্দর লাগে, তাঁর চরিত্রের জন্য মায়া হয়। তিনি চরিত্রটিকে ভেতর থেকে বাঁচিয়েছেন।
তবে একটি বিষয় চোখে পড়ে। ছবিতে তাঁর উচ্চারণে বাংলাদেশের টান স্পষ্ট। যদিও চরিত্রের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সেটি অস্বাভাবিক নয়, তবু মনে হয়েছে, চরিত্রটিকে হয় সম্পূর্ণ বাংলাদেশি পরিচয়ে রাখা যেত, অথবা উচ্চারণে আরও কিছু পরিবর্তন আনা যেত।
কৌশিক সেনের অভিনয়ও অত্যন্ত পরিণত। এমনভাবে চরিত্রটি তৈরি হয়েছে যে কখনও তাঁর উপর রাগ হয়, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর অবস্থাও বোঝা যায়।
অম্বরীশ ভট্টাচার্য তুলনামূলকভাবে কম সময় পর্দায় থাকলেও নিজের উপস্থিতি অনুভব করিয়ে দেন।
শিশুশিল্পীর অভিনয় অত্যন্ত স্বাভাবিক। ইন্দ্রাশিস রায়ও যথেষ্ট ভালো কাজ করেছেন।
ছবির সবচেয়ে বড় সম্পদ— সংলাপ ও ক্লাইম্যাক্স
এই ছবির শেষটাই ছবির আসল শক্তি।
ছবি জুড়ে বারবার ফিরে আসে একটি বিষয়—
একজন মেয়ে বিয়ের পর নিজের বাড়ি ছেড়ে আসে, নিজের পরিচয় বদলায়, নিজের পদবি বদলায়, নতুন সংসারে নিজেকে মানিয়ে নেয়।
এই ভাবনাটাকেই পরিচালক ক্লাইম্যাক্সে এমনভাবে ঘুরিয়ে দেন, যা দর্শককে দীর্ঘক্ষণ ভাবাবে।
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি সংলাপ বিশেষভাবে মনে থেকে যায়—
“তুমি যেখানে এখন চাকরি করো, আমি সেখান থেকেই অবসর নিয়েছি। আমি যেটা পাই সেটা পেনশন, তুমি যেটা পাও সেটা মাসমাইনে।”
এই সংলাপ শুধু দুই নারীর কথোপকথন নয়, বরং দুই প্রজন্মের অভিজ্ঞতারও প্রতিচ্ছবি।
দৃশ্য নির্মাণে কিছু অসাধারণ মুহূর্ত
ছবির একটি দৃশ্যে দুই অর্ধাঙ্গিনীকে একই ফ্রেমে, অর্ধেক মুখের কম্পোজিশনে দেখানো হয়েছে। দৃশ্যটি অত্যন্ত নান্দনিক।
নন্দনে ছবির প্রদর্শনীতে দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রায় প্রতিটি আবেগঘন সংলাপেই হাততালি পড়েছে। ছবি শেষ হওয়ার পর অনেক দর্শক আবেগে কেঁদেছেন। কেউ কেউ চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিনয়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছেন যে তাঁর পায়ে হাত দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
আবহসংগীত দুর্দান্ত, কিন্তু গান?
অনুপম রায়ের সংগীত ছবির অন্যতম শক্তি। খুব মেপে, সংযতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। কোথাও বাড়াবাড়ি নেই, আবার আবেগ তৈরিতেও দারুণ কার্যকর।
তবে গান নিয়ে কিছু আপত্তি থেকেই যায়। আগের ছবির গানগুলোর আবেগ ও আবেদন অনেক বেশি ছিল। নতুন ছবির একটি গান বিশেষভাবে কিছুটা বেমানান মনে হয়।
কোথায় খামতি?
সবচেয়ে বড় সমস্যা চিত্রনাট্যের গতি। ছবিতে প্রচুর সংলাপ রয়েছে। অনেক দৃশ্য আরও ছোট করা যেত। অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যার কারণে ছবির দৈর্ঘ্য বেড়ে গেছে।
প্রথমার্ধে গল্প অনেকটাই ধীরগতির। মূল সংঘাত তৈরি হতে সময় লাগে।
আরও একটি বিষয় কিছুটা দুর্বল মনে হয়েছে। শুভ্রা আবার গল্পে যেভাবে যুক্ত হন, সেই কারণটি পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। অনেকটাই জোর করে গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মনে হতে পারে।
ছবিতে হাস্যরসও তুলনামূলকভাবে কম। প্রথম ছবির কিছু হালকা মুহূর্ত দর্শককে স্বস্তি দিয়েছিল। এখানে আবেগের চাপ এতটাই বেশি যে সেই ভারসাম্যটা কিছুটা অনুপস্থিত।
এছাড়া একটি দৃশ্যে স্কুলের বাইরে মোবাইলে ভিডিও করার অংশটি গল্পের আবহ কিছুটা ভেঙে দেয়।
তাহলে কি সিক্যুয়েলটি দরকার ছিল?
এটাই সম্ভবত ছবির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ একটি ভালো ছবি।
অভিনয় অসাধারণ। শেষের বার্তা শক্তিশালী।
আবেগ গভীর। তবুও বারবার মনে হয়, ‘অর্ধাঙ্গিনী’ যেভাবে শেষ হয়েছিল, তার পর কি সত্যিই এই দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রয়োজন ছিল?
সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর দর্শকের উপরই ছেড়ে দিয়েছেন পরিচালক।
‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ কোনও সাধারণ পারিবারিক ছবি নয়। এটি সম্পর্কের ভাঙাগড়া, আত্মত্যাগ, অপরাধবোধ, ক্ষমা, আত্মসম্মান এবং একজন নারীর পূর্ণতা খুঁজে পাওয়ার গল্প।
পরিচালক যেন শেষ পর্যন্ত বলতে চেয়েছেন— একজন নারী শুধুমাত্র কারও স্ত্রী হয়ে বেঁচে থাকেন না। তিনি নিজের পরিচয়ে সম্পূর্ণ।
অর্থাৎ, অর্ধাঙ্গিনী থেকে পূর্ণাঙ্গিনী হয়ে ওঠার যাত্রাই ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’-র আসল গল্প।
যাঁরা প্রথম ছবি দেখেছেন, তাঁদের জন্য এই ছবি অবশ্যই দেখার। আর যারা দেখেননি, তাঁদেরও আগে ‘অর্ধাঙ্গিনী’ দেখে তারপর ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ দেখাই ভালো। তাহলেই এই সম্পর্কের স্তর, আবেগ এবং ছবির শেষের বক্তব্য পুরোপুরি উপলব্ধি করা যাবে। ছবির প্রধান দুর্বলতা চিত্রনাট্য।
অনেক জায়গায় অপ্রয়োজনীয় সংলাপ ছবিকে দীর্ঘ করেছে। যে দৃশ্যগুলো আরও সংক্ষিপ্ত হতে পারত, সেখানে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ছবির গতি কমিয়ে দিয়েছে।
প্রথমার্ধে গল্প কিছুটা ধীরগতির। মূল সংঘাত তৈরি হতে সময় লাগে। তবে দ্বিতীয়ার্ধ, বিশেষ করে শেষ চল্লিশ মিনিট ছবিকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যায়।
আরও একটি বিষয় প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে— চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের চরিত্রটি যেভাবে আবার গল্পে ফিরে আসে, তার কারণ পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। অনেকটাই জোর করে গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মনে হতে পারে।
এছাড়া ছবিতে হাস্যরসের অভাবও চোখে পড়ে। প্রথম ছবিতে আবেগের পাশাপাশি হালকা মুহূর্ত ছিল। এখানে পুরো ছবিটাই প্রায় গম্ভীর আবহে এগিয়েছে।
রিভিউ: ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’— আবেগে ভরপুর এক সিক্যুয়েল, কিন্তু সত্যিই কি এর প্রয়োজন ছিল?
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক:
বাংলা সিনেমায় সম্পর্ক, ভালোবাসা, ত্যাগ আর মানসিক টানাপোড়েনকে বারবার অন্য মাত্রায় তুলে ধরেছেন পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। সেই ধারাবাহিকতায় মুক্তি পেল ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’, যা মূলত ‘অর্ধাঙ্গিনী’ ছবির গল্পেরই পরবর্তী অধ্যায়। প্রশ্ন একটাই— প্রথম ছবির এত সুন্দর সমাপ্তির পর এই সিক্যুয়েল কি সত্যিই দরকার ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এগোয় নতুন ছবি।
গল্প যেখানে শেষ হয়েছিল, সেখান থেকেই শুরু
ছবির শুরুতেই গান এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের মাধ্যমে দর্শককে মনে করিয়ে দেওয়া হয় ‘অর্ধাঙ্গিনী’-র শেষ অধ্যায়। তারপর শুরু হয় নতুন গল্প।
এবার গল্পের কেন্দ্রে অম্বরীশ ভট্টাচার্যের চরিত্রের নতুন সংসার। সেই সংসারে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার সূত্র ধরে আবার ফিরে আসেন শুভ্রা, অর্থাৎ চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের চরিত্র। অতীতের সম্পর্ক, বর্তমানের দায়িত্ব এবং এক কঠিন সত্য— এই তিনের সংঘাতেই এগোয় ছবির চিত্রনাট্য।
গল্পের বিস্তারিত প্রকাশ করলে ছবির আসল চমক নষ্ট হবে। তাই এটুকুই বলা যায়, সম্পর্কের জটিলতা, অপরাধবোধ, ত্যাগ এবং মানুষের মানসিক অবস্থাকেই এই ছবির মূল উপজীব্য করা হয়েছে।
অভিনয়ই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি
ছবির সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক নিঃসন্দেহে অভিনয়।
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় আবারও প্রমাণ করেছেন তিনি কেন বাংলা সিনেমার অন্যতম সেরা অভিনেত্রী। বিশেষ করে অম্বরীশ ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর একটি আবেগঘন দৃশ্যে তাঁর অভিনয় সত্যিই অসাধারণ। সংযত অভিনয়, চোখের ভাষা এবং সংলাপ বলার ভঙ্গি দর্শকের মনে দীর্ঘদিন থেকে যাবে।
জয়া আহসানকে পর্দায় বরাবরের মতোই সুন্দর লাগে। তাঁর চরিত্রের প্রতি দর্শকের সহানুভূতি তৈরি হয়। চরিত্রের আবেগ, অসহায়তা এবং আত্মসম্মানের লড়াই তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কৌশিক সেনের চরিত্র এমনভাবে লেখা হয়েছে যে, অনেক সময় তাঁর উপর রাগ হয়, আবার কিছুক্ষণ পর তাঁর অবস্থাটাও বোঝা যায়। এই দ্বৈত অনুভূতি তৈরি করতে তাঁর অভিনয় বড় ভূমিকা নিয়েছে।
অম্বরীশ ভট্টাচার্যের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম হলেও নিজের চরিত্রে তিনি যথাযথ। পাশাপাশি শিশুশিল্পী এবং ইন্দ্রাশিস রায়ও যথেষ্ট ভালো কাজ করেছেন।
ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি— শেষের বার্তা
ছবির ক্লাইম্যাক্সই এই সিনেমার প্রাণ।
পুরো ছবি জুড়ে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে— একজন মেয়ে বিয়ের পর নিজের বাড়ি ছেড়ে আসে, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়, এমনকি নিজের পরিচয় পর্যন্ত বদলে ফেলে।
এই ভাবনাটাকেই পরিচালক ছবির শেষে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছেন। কোনও স্পয়লার না দিয়েই বলা যায়, ছবির শেষ মুহূর্তে যে বক্তব্য রাখা হয়েছে, সেটাই গোটা সিনেমাটিকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের মুখে একটি সংলাপ বিশেষভাবে মনে থেকে যায়—
“তুমি যেখানে এখন চাকরি করো, আমি সেখান থেকেই অবসর নিয়েছি। আমি যেটা পাই সেটা পেনশন, তুমি যেটা পাও সেটা মাসমাইনে।”
এই সংলাপ শুধু দুই নারীর সম্পর্ক নয়, জীবনের অভিজ্ঞতা আর সময়ের ব্যবধানকেও সুন্দরভাবে তুলে ধরে।
আবেগ, সম্পর্ক আর সন্দেহের গল্প
ছবি দেখতে দেখতে বারবার মনে হয়, পৃথিবীর কিছু মানুষ হয়তো সারাজীবন শুধু ত্যাগ করেই যান।
প্রথম ছবিতে আমরা দেখেছিলাম, শুভ্রা নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সুমনকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু সেই সত্য কখনও সুমনের জানা হয়নি।
এই অজানা সত্য, লুকিয়ে থাকা অনুভূতি, সন্দেহ এবং ভুল বোঝাবুঝির উপর দাঁড়িয়েই এগিয়েছে নতুন ছবির গল্প।
ছবি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে—
সন্দেহ বড়, না সত্য?
আর মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হওয়া সম্পর্ক কি সত্যিই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই ছবি এগিয়ে চলে।
মেকিং ভালো, কিন্তু কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সেরা নয়
ছবির চিত্রগ্রহণ সুন্দর হলেও কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের আগের কাজের তুলনায় এখানে ভিজ্যুয়াল ভাষা অনেকটাই সাধারণ।
কিছু ফ্রেম অবশ্য চোখে লেগে থাকে। বিশেষ করে দুই অর্ধাঙ্গিনীকে একই ফ্রেমে দেখানোর মুহূর্তগুলো খুব সুন্দরভাবে নির্মাণ করা হয়েছে।
ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছবির আবেগকে আরও গভীর করেছে। তবে গান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থেকেই যায়। আগের ছবির গানগুলোর আবেদন অনেক বেশি ছিল। নতুন ছবির একটি গান বিশেষভাবে কিছুটা বেমানান মনে হতে পারে।
কোথায় দুর্বলতা?
ছবির প্রধান দুর্বলতা চিত্রনাট্য।
অনেক জায়গায় অপ্রয়োজনীয় সংলাপ ছবিকে দীর্ঘ করেছে। যে দৃশ্যগুলো আরও সংক্ষিপ্ত হতে পারত, সেখানে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ছবির গতি কমিয়ে দিয়েছে।
প্রথমার্ধে গল্প কিছুটা ধীরগতির। মূল সংঘাত তৈরি হতে সময় লাগে। তবে দ্বিতীয়ার্ধ, বিশেষ করে শেষ চল্লিশ মিনিট ছবিকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যায়।
আরও একটি বিষয় প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে— চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের চরিত্রটি যেভাবে আবার গল্পে ফিরে আসে, তার কারণ পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। অনেকটাই জোর করে গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মনে হতে পারে।
এছাড়া ছবিতে হাস্যরসের অভাবও চোখে পড়ে। প্রথম ছবিতে আবেগের পাশাপাশি হালকা মুহূর্ত ছিল। এখানে পুরো ছবিটাই প্রায় গম্ভীর আবহে এগিয়েছে।
তাহলে কি সিক্যুয়েলটি প্রয়োজন ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
ছবিটি ভালো। আবেগ আছে, অভিনয় অসাধারণ, ক্লাইম্যাক্স শক্তিশালী।
কিন্তু প্রথম ছবির সমাপ্তি এতটাই পরিপূর্ণ ছিল যে, বারবার মনে হয়— সত্যিই কি এই সিক্যুয়েল দরকার ছিল?
পরিচালক সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অনেকাংশে সফলও হয়েছেন। কিন্তু সেই সংশয় পুরোপুরি কাটে না।
শেষ কথা
‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ নিঃসন্দেহে একটি ভালো বাংলা ছবি। এটি হয়তো প্রথম ছবির মতো নিখুঁত নয়, কিন্তু সম্পর্ক, আত্মত্যাগ, অপরাধবোধ, ক্ষমা এবং মানুষের ভেতরের আবেগকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
যাঁরা ‘অর্ধাঙ্গিনী’ দেখেছেন, তাঁদের জন্য এই ছবি অবশ্যই দেখার মতো। আর যারা সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে তৈরি আবেগঘন সিনেমা পছন্দ করেন, তাঁদের কাছেও ছবিটি নিরাশ করবে না।
রেটিং: ৪/৫
ভালো লাগার কারণ: দুর্দান্ত অভিনয়, শক্তিশালী ক্লাইম্যাক্স, সম্পর্কের গভীরতা, সংবেদনশীল চিত্রনাট্য।
খারাপ লাগার কারণ: অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ সংলাপ, ধীর গতি, কিছু জায়গায় জোর করে গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং প্রথম ছবির তুলনায় দুর্বল মেকিং।
সব মিলিয়ে, ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ এমন একটি ছবি, যা শেষ দৃশ্য পর্যন্ত আপনাকে ধরে রাখবে।
#AajoArdhangini #AajoArdhanginiReview #KaushikGanguly #JayaAhsan #ChurniGanguly #KaushikSen #BengaliCinema #MovieReview #Tollywood
সাম্প্রতিক পোস্ট
নিয়োগ দুর্নীতি কি আগামী দিনে কমবে? জানুন, চাকরির নিয়মে এই পরিবর্তনে আসবে কি স্বচ্ছতা?
এক্সপোজড! ককরোচ জনতা পার্টির নেপথ্যে কোন চক্রান্তের গন্ধ? সত্যিটা জানলে চমকে উঠবেন
মহিলাদের বাসে টিকিট কাটতে হবে না! জানুন, এই কার্ড থাকলেই দিঘা থেকে দার্জিলিং সফর ফ্রী তে
কলেজে ভর্তি নিয়ে বড় খবর, এক নজরে দেখে নিন স্নাতকে ভর্তির আবেদন কবে

