Contractual Employees: সময় বদলায়। বদলাবেই। নিয়নের আলো ফিকে হয়ে এলইডি’র উজ্জলতায়। স্মার্টফোন মাপে রক্তচাপ। মুহূর্তগুলো বন্দি আজ আঙুলের ছোঁয়ায়। তবু ছুটির দিনে ক্লান্ত দুপুরে ভাতঘুম মন। শিরিষ গাছের দীর্ঘ ছায়া আড়মোড়া ভাঙে তপ্ত ছাদে। আর মন কেমন করা রবিবার দুপুরে মজে থাকে ‘রোদ্দুরের কথকতা‘। কলমে-দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
চাকরি আর নিরাপত্তা প্রায় সমার্থক শব্দ। মাসের শেষে মাইনে। সংসার, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া, বিদ্যুতের বিল , ওষুধপত্র , লোক লৌকিকতা মানে পুরো ছকে বাঁধা ‘সুখী গৃহকোণ, গ্রামোফোন’ টাইপ। ক্রমবর্ধমান চাকরির চাহিদা আর যোগানের অসাম্য চুক্তিদাস নামক এক বকচ্ছপ প্রাণীর জন্ম দিল। এখানে আপনার হাবভাব স্থায়ী চাকুরীজীবির মতো কিন্তু আপনার চাকরিটি স্থায়ী নয়। আপনি স্থায়ী কর্মীর মতোই অফিস করবেন, কাজ করবেন, রিপোর্ট বানাবেন, মিটিং করবেন, বড়ো বড়ো ডায়ালগ দেবেন, বসের ফোন ধরবেন, ছুটি চাইবেন কিন্তু পাবেন না , রাজা উজির মারবেন , দু চারটে ঢপ দেবেন । শুধু ছোট্ট একটু ফারাক আপনাকে সয়ে নিতে হবে – চাকরিটা আপনার হবে কিন্তু চাকরির ভবিষ্যৎ টা নয়।
পড়েছিলাম, দাসপ্রথা উঠে গেছে পৃথিবী থেকে। কিন্তু একেবারে ওঠেনি । ফিরে এসেছে নতুন ফর্মে। যাকে বলে নতুন বোতলে পুরোনো মদের মতো। চুক্তিদাসের জীবনে সবথেকে বড়ো দর্শন হয়ে তিনটি শব্দ লেখা থাকবে নিয়োগপত্রে, ‘চুক্তি নবীকরণ সাপেক্ষ ‘। আশায় বাঁচে চাষার মতো। অর্থাৎ আজ আছেন, কাল আছেন কি না সেটা আগামীকাল জানাবে কর্তৃপক্ষ। আপনি চাকরি পেলেন। মা বললেন, ’ যাক নিশ্চিন্তি’ । বন্ধুরা বললো, ‘ কবে পার্টি দিছিস ভাই ‘? আপনিও ভাবতে বসে গেলেন, ঠুকরে ঠুকরে চলা গরুরগাড়ি এবার রকেটের গতিতে দৌড়োবে। বিজ্ঞাপনে যেরকম দেখা যায়।
নিয়োগপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা ভালো। দ্বিতীয় পৃষ্ঠা ভালো। তৃতীয় পৃষ্ঠায় চোখ আটকে গেলো। —’The appointment is purely contructual…’ ব্যস, আত্মবিশ্বাসে সামান্য জ্বর চলে এলো। তার নিচে—’ The contract may be renewed…’ জ্বর একটু বেড়ে গেলো। আর যদি লেখা থাকে- ‘Subject to availability of funds…’ তখনই একদম বুঝে গেলেন , আপনার ভবিষ্যৎ কোনো এক অজানা ফাইলের মধ্যে ঠিকঠাক শ্রাদ্ধশান্তি না হওয়া অপঘাতে মৃত প্রেতের মতো ঘুরছে। ফাইলটি জলে, স্থলে না অন্তরীক্ষে ? দেবা ন জানন্তি কুত মনুষ্য।
এই কাজের বহু ধরণের পুরস্কার রয়েছে। প্রথম পুরস্কার – আরও কাজ। দ্বিতীয় পুরস্কার – আরো কাজ । তৃতীয় পুরস্কার – আরও কাজ।
চুক্তিদাস কাজ করে স্থায়ী কর্মীর মতো, কিন্তু ভবিষ্যৎ ভাবে অতিথির মতো।
অফিসে নতুন কাজ এলেই ফিসফাস প্রশ্ন- কে কে কে ?’ কে করবে?’ সবাই চুপ।
তারপর চোখ যায় আপনার দিকে। ‘ওকে দিন না!’
আপনি কাজ নিয়ে নিলেন । কারণ কাজ না করলে সমস্যা, আর ভালো করলে আরও বড় সমস্যা – আরও কাজ!
ধরুন আপনি বলে ফেললেন , ‘কাজটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে,’ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এসে গেলো – ‘আপনি তো সব্যসাচী মশাই! আমার বাড়িতে বলছিলো আপনার বুদ্ধিশুদ্ধি একেবারে অফিসার দের মতো’। এই বাক্যটি প্রশংসা, না কি অতিরিক্ত কাজ দেওয়ার কূটনৈতিক পদ্ধতি ভাবতে ভাবতেই আপনি বধ হয়ে গেছেন অভিমন্যুর মতো । আপনি চক্রব্যূহে ঢোকার পথ জানেন কিন্তু বেরোনোর রাস্তা আপনার জানা নেই। চুক্তি বাড়বে তো? চুক্তির শেষের দিকে অফিসে প্রশ্ন করলে উত্তর – ‘দেখা যাক’। – ‘ফাইল গেছে’। – ‘উপর থেকে কিছু আসেনি’। – ‘অনুমোদন হলে হবে’। এই ‘দেখা যাক’ কথাটাই যেন চুক্তিদাসের কাছে একটা অসম্পূর্ণ উপন্যাস। লেখক শেষটা লিখতে ভুলে গেছেন।
একদিন অবিবাহিতা সহকর্মী সলজ্জ হেসে বললেন, – ‘শুনেছেন? চুক্তি বাড়ছে।’
আপনিও নেতাজি সুভাষের মতো বাড়িতে ফোন করে বলে দিলেন , জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন আপনি। তখন আপনি কিন্তু জানেন না , আজ বাদে কাল স্বয়ং গান্ধীজি বলে বসবেন ‘পট্টভির পরাজয় আমার পরাজয় ‘। অন্য কোনো ছুপা রুস্তমের গডফাদারের কল্যাণহস্ত মাথায় নিয়ে রিনিউয়াল হয়ে গেলো , আর আপনারটা নট। অথবা ঝুলে রইলো । আপনি বাড়িতে বললেন, – ‘মানে চাকরিটা বাড়তে পারে’। প্রতিপ্রশ্ন ধেয়ে এলো – ‘পারে মানে’? – ‘মানে… এখনও নিশ্চিত নয়’। তারমানে আনন্দও এখানে চুক্তিভিত্তিক।
চুক্তিদাসের জীবনের সব সিদ্ধান্ত অনন্ত কালের জন্য থেমে থাকবে।
স্থায়ী কর্মী যখন ভাবছে, – শীতে দার্জিলিং যাব, চুক্তিদাস তখন ক্যালেন্ডার দেখতে দেখতে ভাবছে – তখন আমার চুক্তি থাকবে তো? – ‘বিয়ে?’ – ‘চুক্তি বাড়লে’। – ‘ঋণ’? -চুক্তি বাড়লে। – ‘বাড়ি’? -আগে চুক্তি বাড়ুক। -‘নতুন ফ্রিজ’? – দাঁড়াও, আগে দেখি!
অর্থাৎ ,জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর একটাই— ‘চুক্তি নবীকরণ হলে দেখা যাবে’।
বেতন আসলে একদিনের উৎসব । মাসের শেষে মোবাইলে মেসেজ আসে – Salary credited. মনে হয় – ‘আহা! পৃথিবী এখনও আমাকে ভুলে যায়নি’। তারপর বিদ্যুৎ বিল, ইএমআই, বাড়িভাড়া, স্কুলের ফি, বাজার—এক এক করে সবাই এসে হাজির। ব্যাংক ব্যালান্স দেখে মনে হয় বেতন এসেছিল। কিছুক্ষণ বসেছিল। তারপর চলে গেছে।
নতুন কাজ, নতুন প্রযুক্তি , নতুন মানুষ । প্রতিদিন সে শুধু নিজেকে মানিয়ে নিতে শেখে, নিজেকে বদলে নিতে শেখে, মোবাইলের নতুন সফটওয়ারের মতো। তার আসল সম্পদ তখন পদ নয় – যোগ্যতা। চুক্তিদাস তাই বাইরে থেকে যতটা অনিশ্চিত, ভিতরে ভিতরে ততটাই প্রস্তুত। আসলে এটা শুধু চাকরির গল্প নয়। এটা অপেক্ষার গল্প, দুশ্চিন্তার গল্প, আবার আশারও গল্প।
জীবন চুক্তির মেয়াদ দেখে চলে না। আর তাই চুক্তিদাসের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা হয়তো এই – ‘চাকরিটা আজ আছে—আজকের দিনটা অন্তত আমার।’ আর বাকি সব – ‘Terms and Conditions Apply’. আর সেই জন্যই একশো বছরের উত্তম কুমার আজও সম্পন্ন জীবনের মোহ ছেড়ে গেয়ে চলেছেন, – ‘জীবন খাতার প্রতি পাতায় যতই লেখো হিসেব নিকেশ কিছুই রবে না’।।
#ContractualEmployees #ContractJobs #JobSecurity #TemporaryEmployment #EmploymentUncertainty #ContractRenewal #WorkplaceStress
সাম্প্রতিক পোস্ট
‘সাথীরা, প্রশ্নফাঁস মাফিয়াদের রেয়াত নয়’– সংসদে বিল পাসের পর প্রথমবার কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?
সিলেবাসে বড় পরিবর্তন কবে থেকে? শিক্ষক নিয়োগেও সুখবর? কী বললেন শিক্ষামন্ত্রী?
আবার কি বদলে যাবে নোট? দেশে আসছে প্লাস্টিকের নোট,জানুন, কী বদল আসছে?
১লা আগস্ট থেকে স্কুলের খাবারের দায়িত্ব ইস্কনের, ডিম বিতরণ, ও শিক্ষক নিয়োগে বড় ঘোষণা
কেন জেন জির ‘ক্রাশ’ সৌরভ দাস ও অভিজিৎ দীপকে? নেপথ্যে কী রহস্য?

