একদিকে নীল-সাদা আর্জেন্টিনার উৎসব, অন্যদিকে চিন ও ইউক্রেনের হাই-ভোল্টেজ এন্ট্রি। সল্টলেকের মেলাপ্রাঙ্গণ কি এবার হয়ে উঠবে বিশ্ব রাজনীতির মিনিয়েচার সংস্করণ? জানুন Book Fair International Stalls-এর খুঁটিনাটি এবং এই আন্তর্জাতিক সমীকরণের আসল তাৎপর্য।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: শীতের কলকাতা মানেই ধুলো ওড়া বিকেল, গিল্ডের সেই চেনা লোগো, আর লিটল ম্যাগাজিনের আড্ডা। কিন্তু ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা এবার শুধু বই কেনার জায়গা নয়, বরং হয়ে উঠতে চলেছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক ‘হটস্পট’।
প্রতিবারই বইমেলায় একটি নির্দিষ্ট থিম কান্ট্রি থাকে। এবার যেমন আর্জেন্টিনা। কিন্তু এবারের মেলায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মেসি বা ম্যারাডোনার দেশ যতটা না আছে, তার চেয়েও বেশি কৌতূহল জাগিয়েছে দুটি নাম— গণপ্রজাতন্ত্রী চিন এবং ইউক্রেন।
আরও পড়ুন : ৪৯ তম কলকাতা বইমেলা কবে শুরু হচ্ছে? │এবারের থিম কান্ট্রি কি?
একদিকে দীর্ঘ ১৫ বছরের ‘বনবাস’ কাটিয়ে বইমেলায় ফিরছে এশিয়ার মহাশক্তিধর চিন। অন্যদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আবহে প্রথমবারের জন্য স্টল দিচ্ছে ইউক্রেন। বিশ্ব রাজনীতির এই দুই মেরুর উপস্থিতি বইমেলার ম্যাপে এক নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে। গিল্ডের অন্দরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, এবারের মেলা আদতেই হতে চলেছে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’।
আসুন, দেখে নিই বইমেলার আন্তর্জাতিক স্টলের এই নতুন মানচিত্র এবং তার পেছনের গল্প।
ড্রাগনের প্রত্যাবর্তন: ১৫ বছর পর কেন?
শেষবার যখন চিন কলকাতা বইমেলায় অংশ নিয়েছিল, তখন স্মার্টফোনের এত দাপট ছিল না। দীর্ঘ দেড় দশক কলকাতা বইমেলা থেকে দূরে থাকার পর হঠাৎ কেন ফিরছে বেইজিং?
বিশ্লেষকদের মতে, এটি চিনের ‘সফ্ট পাওয়ার’ (Soft Power) ডিপ্লোম্যাসির অংশ। লাদাখ বা অরুণাচল নিয়ে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত থাকলেও, চিন জানে সংস্কৃতিই হলো মানুষের মনে ঢোকার সহজ রাস্তা। কলকাতা হলো ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। তাই এখানে নিজেদের সাহিত্য, মান্দারিন ভাষা, ক্যালিগ্রাফি এবং শিল্পকলা তুলে ধরার মাধ্যমে চিন আবার নতুন করে জনসংযোগ গড়তে চাইছে।
শোনা যাচ্ছে, চিনের স্টলে এবার মাও সে তুং-এর রেড বুকের পাশাপাশি থাকবে আধুনিক চিনা সাহিত্যের ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদ। থাকবে চিনা চা এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী পেপার আর্ট। দীর্ঘ বিরতির পর ড্রাগনের এই এন্ট্রি পাঠকদের মনে কতটা দাগ কাটতে পারে, সেটাই দেখার।
কিয়েভ থেকে কলকাতা: ইউক্রেনের প্রথম পদচারণা
এবারের বইমেলার সবথেকে আবেগঘন জায়গাটি হতে চলেছে ইউক্রেনের স্টল। গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়ার মিসাইল হানায় যে দেশটির লাইব্রেরিগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, সেই দেশ আজ কলকাতায় এসেছে তাদের সাহিত্য নিয়ে।
ইউক্রেনের অংশগ্রহণ শুধু বই বিক্রি নয়, এটি একটি ‘স্টেটমেন্ট’। এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। জানা গেছে, তাদের স্টলে যুদ্ধকালীন সাহিত্য (War Literature), ইউক্রেনীয় লোককথা এবং তাদের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর লেখা বইগুলোই প্রাধান্য পাবে। নীল-হলুদ পতাকার রঙে সাজানো এই স্টলটি হয়তো বুঝিয়ে দেবে—কলম কখনও কখনও কামানের চেয়েও শক্তিশালী হয়। বাঙালি পাঠকরা, যারা সবসময় বিপ্লব ও সংগ্রামের পক্ষে, তারা যে ইউক্রেনের স্টলে ভিড় জমাবেন, তা বলাই বাহুল্য।
একই ছাদের তলায় রাশিয়া ও ইউক্রেন?
বইমেলার আন্তর্জাতিক কমপ্লেক্সের সবথেকে বড় প্রশ্ন—রাশিয়া এবং ইউক্রেন কি পাশাপাশি থাকবে? কলকাতা বইমেলায় রাশিয়ার স্টল বরাবরই খুব জনপ্রিয় হয়। তাদের ধ্রুপদী সাহিত্য, তলস্তয়, দস্তয়েভস্কির অনুবাদ এবং শিশুদের জন্য হরেক রঙের বই বাঙালির নস্টালজিয়া।
সেখানে এবার ইউক্রেনের উপস্থিতি এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। যদিও গিল্ডের নিয়ম অনুযায়ী বইমেলা হলো সম্প্রীতির জায়গা, তবুও দুই যুদ্ধরত দেশের স্টল কাছাকাছি থাকলে নিরাপত্তার পাশাপাশি এক মনস্তাত্ত্বিক স্নায়ুযুদ্ধও যে চলবে, তা অস্বীকার করার জায়গা নেই। পাঠকরা হয়তো এক পা হেঁটেই ‘যুদ্ধ’ থেকে ‘শান্তি’র সীমানা পার করবেন।
আর্জেন্টিনা: নীল-সাদার উৎসব
থিম কান্ট্রি হিসেবে আর্জেন্টিনার প্যাভিলিয়ন তো থাকছেই। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্কের ইতিহাসের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার জাদুকরী সাহিত্যের সম্ভার থাকবে। তবে চিন ও ইউক্রেনের উপস্থিতিতে আর্জেন্টিনার ফোকাস যাতে সরে না যায়, সেদিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে আয়োজকরা।
বাংলাদেশ: কাঁটাতার পেরিয়ে বাঙালির টান
আন্তর্জাতিক স্টলের কথা বললে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আসবেই। রাজনৈতিক পালাবদলের পর ওপার বাংলার প্রকাশকদের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও, বইমেলার প্রাণভোমরা কিন্তু সেই বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নই। দুই বাংলার সাহিত্যের এই মিলনমেলা ছাড়া কলকাতা বইমেলা অসম্পূর্ণ।
ব্রিটেন, আমেরিকা ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ
এছাড়াও প্রতিবারের মতো ব্রিটিশ কাউন্সিল, আমেরিকান সেন্টার, ফ্রান্স (Alliance Française), স্পেন এবং লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশগুলো তাদের নিজস্ব সম্ভার নিয়ে হাজির থাকবে। বিশেষ করে স্পেনের স্টলে এবার স্প্যানিশ ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বইমেলার মাঠে যখন ধুলো উড়বে, তখন কে চিনা, কে ইউক্রেনীয় আর কে রাশিয়ান—তা মনে রাখবে না পাঠক। তারা খুঁজবে ভালো বই, ভালো গল্প। ১৫ বছর পর চিনের ফিরে আসা প্রমাণ করে, অভিমান বা দূরত্ব বেশিদিন থাকে না। আর ইউক্রেনের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, ধ্বংসের মাঝেও সৃষ্টি বেঁচে থাকে। এবারের Book Fair International Stalls যেন আমাদের শেখাচ্ছে—রাজনীতি যেখানে দেয়াল তোলে, বই সেখানে সেতু বাঁধে।
তাই এবারের বইমেলায় শুধু বই কিনবেন না, একটু সময় নিয়ে আন্তর্জাতিক কমপ্লেক্সে ঘুরে আসবেন। দেখবেন, সল্টলেকের এই এক টুকরো জমিতে কীভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে গোটা পৃথিবী।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন!
সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট ঘটনাগুলোর এক্সক্লুসিভ আপডেট — আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
Most Viewed Posts
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- মোটা হবেন না, মিষ্টি খান নিশ্চিন্তে │ Guilt-Free Sweets for Diwali Delight
- Dharmendra death: ধর্মেন্দ্রর জীবনের এই ১১টি তথ্য অনেকেই জানেন না │ 11 Untold Facts About Dharmendra
- জানেন কি নবরাত্রির চতুর্থ দিনে মা কুষ্মাণ্ডা পূজা কেন বিশেষ? ︱Why Ma Kushmanda Puja on Navratri Day 4 is Special?
- Digha Jagannath Temple Facts ︱দীঘা জগন্নাথ মন্দির সম্পর্কে জানুন এই দশটি অজানা তথ্য

