বাইবেলের ১৮ বছরের নীরবতা নাকি প্রাচ্যের গোপন ইতিহাস? জানুন যিশুর Lost Years of Jesus বা নিখোঁজ বছরগুলিতে ভারতে আসা, বেদ শিক্ষা এবং কাশ্মীরের রোজাবাল সমাধির রোমহর্ষক বিতর্কিত তত্ত্ব।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : শ্রীনগর। ভূস্বর্গ কাশ্মীরের এক ব্যস্ত জনপদ। ডাল লেকের সৌন্দর্য আর শিকারা ভ্রমণের ভিড় পেরিয়ে আপনি যদি পুরনো শ্রীনগরের খানিয়ার (Khanyar) এলাকার সরু গলিতে প্রবেশ করেন, তবে একটি সাধারণ পুরনো ভবনের সামনে এসে থমকে দাঁড়াবেন। ভবনটি দেখতে অনেকটা মাজারের মতো, নাম ‘রোজাবাল’ (Rozabal)।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এটি কোনো সাধারণ সুফি সন্তের দরগা। কিন্তু এই দরগার ভেতরেই নাকি লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য। স্থানীয় বিশ্বাস এবং কিছু বিতর্কিত ঐতিহাসিক তত্ত্ব দাবি করে—এখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন স্বয়ং যিশু খ্রিস্ট!
অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন, যিশু তো জেরুজালেমে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন এবং পরে স্বর্গে আরোহণ করেছিলেন। তাহলে তিনি ভারতে আসবেন কীভাবে? কিন্তু বাইবেলের পাতায় যিশুর জীবনের একটি বিশাল অধ্যায় অনুপস্থিত। ১২ বছর বয়স থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত—এই দীর্ঘ ১৮ বছর যিশু কোথায় ছিলেন, কী করেছিলেন, তার কোনো স্পষ্ট উল্লেখ বাইবেলে নেই। ঐতিহাসিকরা একে বলেন ‘The Lost Years of Jesus’।
কোথায় ছিলেন তিনি এই দীর্ঘ সময়? তিনি কি সিল্ক রুট ধরে পৌঁছে গিয়েছিলেন ভারতে? শিখেছিলেন বৌদ্ধধর্ম ও বেদ? আজ আমরা ওলটাবো ইতিহাসের সেই ধুলোমাখা পাতা, যেখানে বিশ্বাস আর বিতর্কের এক অদ্ভুত সহাবস্থান রয়েছে।
তিব্বতের হিমিস গুম্ফা ও নিকোলাস নতোভিচ
এই রহস্যের জট খোলার সূত্রপাত ১৮৮৭ সালে। রাশিয়ান সাংবাদিক এবং অভিযাত্রী নিকোলাস নতোভিচ (Nicolas Notovitch) ভারত ও তিব্বত ভ্রমণে আসেন। লাদাখের লেহ শহরের কাছে অবস্থিত বিখ্যাত ‘হিমিস গুম্ফা’ বা হিমিস মঠে তিনি কিছুদিন অবস্থান করেন।
সেখানে থাকাকালীন প্রধান লামা তাঁকে কিছু প্রাচীন পুঁথি বা স্ক্রোল দেখান। নতোভিচের দাবি অনুযায়ী, ওই পুঁথিগুলোতে ‘ঈশা’ (Issa) নামে এক বিশেষ সন্তের জীবনী লেখা ছিল। নতোভিচ চমকে ওঠেন যখন তিনি পড়েন যে, ঈশা ইসরায়েল থেকে এসেছিলেন এবং তিনি ছিলেন ঈশ্বরের পুত্র।
১৮৯৪ সালে নতোভিচ তাঁর বই ‘The Unknown Life of Jesus Christ’ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, যিশু ১৩ বছর বয়সে ঘর ছেড়ে বনিকদের সঙ্গে সিল্ক রুট ধরে ভারতে চলে আসেন। তিনি প্রথমে সিন্ধু নদের অববাহিকায় আর্যদের কাছে বেদ ও উপনিষদ শেখেন। এরপর তিনি জগন্নাথ ধাম (পুরী), রাজগৃহ এবং বেনারসে গিয়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন। কিন্তু জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা করায় ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তাঁর সংঘাত হয় এবং তিনি নেপাল ও তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন।
৩০ বছর বয়সে তিনি আবার নিজের দেশে ফিরে যান এবং ধর্ম প্রচার শুরু করেন। নতোভিচের এই বই সারা বিশ্বে তোলপাড় ফেলে দেয়। যদিও ভ্যাটিকান এবং তৎকালীন চার্চ এই দাবি সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয়, কিন্তু রহস্যের বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল।
রোজাবাল: ক্রুশবিদ্ধ মানুষের সমাধি?
নতোভিচের তত্ত্ব যদি সত্যি হয়, তবে প্রশ্ন জাগে—যিশু কি ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন? নাকি তিনি সেই যন্ত্রণা সহ্য করে বেঁচে গিয়েছিলেন এবং আবার ভারতে ফিরে এসেছিলেন?
কাশ্মীরের রোজাবাল দরগাটি ‘ইউজ আসাফ’ (Yuz Asaf) নামক এক সাধকের সমাধি। স্থানীয় ভাষায় ‘ইউজ আসাফ’ মানে হলো ‘নিরাময়কারী’ বা ‘The Healer’। এই সমাধির কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য গবেষকদের ভাবিয়ে তোলে:
- পূর্ব-পশ্চিম শয়ানো: মুসলিম রীতি অনুযায়ী মৃতদেহ উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে কবর দেওয়া হয়। কিন্তু রোজাবালের সমাধিটি ইহুদি রীতি মেনে পূর্ব-পশ্চিম মুখ করে রাখা।
- পায়ের ছাপ: সমাধির পাশে একটি পাথরে দুটি পায়ের ছাপ খোদাই করা আছে। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেই পায়ের ছাপে এমন দুটি ক্ষতের দাগ আছে, যা একমাত্র ক্রুশবিদ্ধ মানুষের পায়েই থাকা সম্ভব। অর্থাৎ, বড় লোহার পেরেক ঠোকলে যেমন দাগ হয়, ঠিক তেমন।
অনেকের মতে, ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর যিশু মারা যাননি। তিনি ‘Resurrection’ বা পুনরুত্থানের পর গোপনে জেরুজালেম ত্যাগ করেন এবং তাঁর মা মেরিকে নিয়ে কাশ্মীরে চলে আসেন। সেখানেই তিনি ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। বিশ্বাস করা হয়, কাশ্মীরের ‘মরি পাহাড়’ (Murree) আসলে মা মেরির সমাধি।
ভবিষ্য পুরাণে বর্ণিত ‘ঈশাপুত্র’
শুধু বৌদ্ধ পুঁথি বা কাশ্মীরি লোককথা নয়, সনাতন ধর্মের প্রাচীন গ্রন্থ ভবিষ্য পুরাণ-এও (Bhavishya Purana) এক শ্বেতাঙ্গ সাধুর উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরাণের প্রতিসর্গ পর্বে বর্ণিত আছে যে, রাজা শালিবাহন (যিনি বিক্রমাদিত্যের নাতি) একবার হিমালয়ের পাদদেশে শিকারে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এক ফর্সা, দীর্ঘদেহী এবং শ্বেতবস্ত্র পরিহীত সাধুর দেখা পান। রাজা কৌতূহলী হয়ে তাঁর পরিচয় জানতে চান।
সেই সাধু উত্তর দেন, “আমি এক কুমারী নারীর গর্ভে জন্মেছি। আমি ম্লেচ্ছদের দেশে সত্য এবং ধর্মের প্রচার করেছি। আমি ঈশ্বরের পুত্র (ঈশাপুত্র)।” অনেকে মনে করেন, এই বর্ণনা হুবহু যিশু খ্রিস্টের সঙ্গে মিলে যায়। যদিও অনেক সংস্কৃত পণ্ডিতের মতে, ভবিষ্য পুরাণের এই অংশটি অনেক পরে সংযোজিত হয়েছে, তবুও এই কাকতালীয় মিল উপেক্ষা করা কঠিন।
যুক্তিবাদী মত ও বিতর্ক
স্বাভাবিকভাবেই, মেইনস্ট্রিম ক্রিশ্চানিটি বা মূল ধারার খ্রিস্টান ধর্ম এই তত্ত্বকে ‘গল্পকথা’ বলে উড়িয়ে দেয়। তাদের মতে, যিশু এই ১৮ বছর সাধারণ কাঠমিস্ত্রি হিসেবে জীবনযাপন করেছিলেন বলেই বাইবেলে তার উল্লেখ নেই। নিকোলাস নতোভিচকে অনেকে ‘প্রতারক’ বলেও অভিহিত করেছেন। এমনকি হিমিস মঠের লামারাও পরবর্তীকালে এই পুঁথির অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন (যদিও অনেকে বলেন ব্রিটিশদের চাপে তাঁরা চুপ থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন)।
কিন্তু ১৯২২ সালে স্বামী অভেদানন্দ (রামকৃষ্ণ মঠের সন্ন্যাসী) যখন হিমিস মঠে যান, তিনিও দাবি করেছিলেন যে তিনি ওই পুঁথিগুলো দেখেছেন এবং তার অনুবাদ করেছেন। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে এর উল্লেখ পাওয়া যায়, যা নতোভিচের দাবিকে কিছুটা হলেও জোরালো করে।
বিশ্বাস বনাম ইতিহাস
যিশু ভারতে এসেছিলেন কি না, তা হয়তো কোনোদিনও অকাট্য প্রমাণ দিয়ে সাব্যস্ত করা যাবে না। কিন্তু এই গল্পটি আমাদের এক উদার আকাশ দেখায়। এটি আমাদের ভাবতে শেখায় যে, ধর্মের সীমানা মানুষ তৈরি করেছে, কিন্তু জ্ঞান বা সত্যের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। যিশু যদি সত্যিই বেনারসে বেদ বা হিমালয়ে বৌদ্ধধর্ম শিখে থাকেন, তবে তা প্রমাণ করে যে—পৃথিবীর সব মহান ধর্মের সারমর্ম আসলে এক। প্রেম, ক্ষমা এবং ত্যাগ। রোজাবালের ওই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সত্যিই ঈশ্বরের পুত্র শুয়ে আছেন কি না জানা নেই, তবে সেই বিশ্বাসটুকু আজও কাশ্মীরের মাটিতে এক অন্যরকম পবিত্রতা মেখে রেখেছে।
ইতিহাসের এই ধূসর অধ্যায়টি তাই চিরকাল Jesus in India Mystery হয়েই থাকুক। কারণ, কিছু রহস্যের সমাধান হয়ে গেলে তার সৌন্দর্য হারিয়ে যায়।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- Gen Z-এর প্রেমের নতুন শব্দভান্ডার জানেন? ভালোবাসার নতুন ব্যাকরণ শিখুন | Gen Z Love Trends 2026
- ব্যস্ত সকালে এই ৫টি Tiffin Recipe রাখুন রোজের তালিকায় | Easy Tiffin Recipes
- ঠাকুর, দেবতা, ভগবান ও ঈশ্বর কি একই? গুলিয়ে ফেলার আগে জেনে নিন আসল তফাৎ | God vs Deity Meaning in Bengali
- জানুন, ব্যক্তি সুভাষের অনন্য প্রেমকাহিনী: সুভাষ ও এমিলি
- গান্ধী বনাম নেতাজি—মূল পার্থক্যটা কোথায়? | Gandhi vs Netaji

