Mukul Roy controversy: মুকুল রায়ের তৃণমূল থেকে বিজেপিতে এবং পরে পুনরায় তৃণমূলে ফেরা ঘিরে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। সমর্থকদের মতে, এটি ছিল কৌশলগত সিদ্ধান্ত, বিরোধীদের দাবি—এটি আদর্শগত অস্থিরতার প্রতিফলন।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলার রাজনীতিতে “মুকুল রায়” নামটি উচ্চারিত হলেই যেন একসঙ্গে উঠে আসে কৌশল, দলবদল, ক্ষমতার সমীকরণ আর বিতর্কের দীর্ঘ ছায়া। কেউ তাঁকে বলেন রাজনীতির চাণক্য, কেউ আবার তীব্র সমালোচনায় দেখেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দলের সংগঠন গড়ে তুলেছেন, নির্বাচনী রণকৌশল তৈরি করেছেন, আবার দল পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে শিরোনামেও থেকেছেন বহুবার।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুকুল রায়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়া ছিল বাংলার রাজনীতির অন্যতম বড় একটি মোড়। যে মুকুল রায় ছিলেন তৃণমূলের “সেকেন্ড-ইন-কমান্ড”, সেই নেতার সাথে দলনেত্রীর বিচ্ছেদের পেছনে একাধিক জটিল কারণ ছিল। এই প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরছি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পাঁচটি অজানা দিক, যা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করবে নতুনভাবে।
আরও পড়ুন : নেপথ্যের রাজনীতির কারিগর: আলোয় না থেকেও প্রভাবশালী মুকুল রায়
সংগঠনের কারিগর হিসেবে মুকুল রায়
বাংলার রাজনীতিতে সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মুকুল রায়ের দক্ষতা বহুবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেসের শুরুর দিনগুলোতে জেলা থেকে বুথ স্তর পর্যন্ত সংগঠন বিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি ছিলেন মাঠের কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এক নেতা, যিনি কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব সংগঠনে বিশ্বাস করতেন। দলের ভিত মজবুত করতে তিনি নিয়মিত বৈঠক, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিতেন। এই সংগঠনভিত্তিক রাজনীতিই পরবর্তীকালে বড় নির্বাচনী সাফল্যের পথ তৈরি করে দেয়। অনেকেই বলেন, তিনি আড়ালে থেকে কাজ করতে পছন্দ করতেন—সামনের সারিতে না থেকেও কৌশলের সুতো টানতেন নিঃশব্দে।
দলবদলের রাজনীতি
মুকুল রায়ের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় তাঁর দলবদল। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিজেপি, আবার পরবর্তীকালে পুনরায় তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন—এই ঘটনাগুলি তাঁকে সংবাদ শিরোনামে বারবার ফিরিয়ে এনেছে। এই দলবদলকে কেউ দেখেন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে, আবার কেউ বলেন এটি ছিল ব্যক্তিগত ও আদর্শগত মতভেদের ফল। বাস্তবে রাজনীতিতে দল পরিবর্তন নতুন কিছু নয়, কিন্তু মুকুল রায়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায় কারণ তিনি নিজেই ছিলেন একাধিক দলের সাংগঠনিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর পদক্ষেপের প্রভাব পড়েছে কর্মী স্তরেও, যা বাংলার রাজনীতির সমীকরণে বড় পরিবর্তন এনেছে।

বিতর্ক ও আইনি লড়াই
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি এবং নারদ স্টিং অপারেশন। সিবিআই যখন মুকুল রায়কে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে, তখন দলের ভেতরে গুঞ্জন শুরু হয় যে তিনি নিজেকে বাঁচাতে বিজেপির সাথে যোগাযোগ রাখছেন। মুকুল রায়ের সাথে দূরত্ব তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কারণ ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতিতে অভিষেক এবং তাঁর দ্রুত ক্ষমতা বৃদ্ধি। মুকুল রায় নিজেকে দলের অঘোষিত দুই নম্বর নেতা মনে করতেন। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন অভিষেককে যুব তৃণমূলের দায়িত্ব দিয়ে আগামীর নেতা হিসেবে তুলে ধরলেন, তখন মুকুল রায় কোণঠাসা বোধ করতে থাকেন। আগে দলের সমস্ত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত মুকুল রায় নিতেন, কিন্তু অভিষেকের প্রভাবে তাঁর সেই একাধিপত্য খর্ব হয়। এক সময় তৃণমূলের টিকিট বণ্টন থেকে শুরু করে জেলাস্তরের সংগঠন—সবই ছিল মুকুল রায়ের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে তাঁর ডানা ছাঁটা শুরু হয়। তাঁকে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জেলা সফর এবং বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁকে আর আগের মতো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল না।
মুকুল রায় যখন দেখলেন দলে তাঁর জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, তখন তিনি বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেন। তিনি তৎকালীন বিজেপি নেতাদের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে থাকেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপোষহীন বিজেপি-বিরোধী অবস্থানের বিপরীতে মুকুল রায়ের এই নরম মনোভাব দলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচন কমিশনের নথিতে যখন তৃণমূল কংগ্রেস দল হিসাবে স্বীকৃতি পায়, তখন ও মুকুল রায়ের নাম ছিল ওপরের সারিতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন লোকসভার সদস্যপথ ছাড়েননি, তার সাংগঠনিক স্তম্ভ ছিলেন মুকুল রায়। দলের নীচু তলার কর্মীদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল অবাধ। জনসংযোগে তিনি সব সময় গুরুত্ব দিতেন। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন মুকুল রায়। বাংলার রাজনীতিতে দল বদল বিষয়টি তার হাত ধরেই অন্য মাত্রা পায়। বাম আমলের দাপুটে নেতাদের তৃণমূলের শিবিরে নিয়ে আসা অথবা তৃণমূলের বিধায়কদের বিজেপি তে নিয়ে যাওয়া সবক্ষেত্রেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ভোটে জেতার চেয়েও প্রতিপক্ষের সংগঠন ভেঙে দেওয়া বেশি কার্যকরী।
নির্বাচনী কৌশলের মস্তিষ্ক
অনেক রাজনৈতিক মহলে মুকুল রায়কে নির্বাচনী রণকৌশলের বিশেষজ্ঞ বলা হয়। ভোটের আগে প্রার্থী নির্বাচন, জোটের হিসাব, বিরোধী শক্তির দুর্বলতা চিহ্নিত করা—এসব ক্ষেত্রে তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি ভোটের অঙ্ক কষতে পারতেন খুব সূক্ষ্মভাবে। কোন অঞ্চলে কোন ইস্যু কাজ করবে, কোথায় কাকে সামনে আনা উচিত, এইসব সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব ছিল স্পষ্ট। তাঁর রাজনৈতিক পথচলার একটি বড় বৈশিষ্ট্যই হলো পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির পদে নিয়োগে আইনি জটিলতা
২০১৭ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়ার পর মুকুল রায় ২০১৭ সালের শেষদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন। এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বিজেপির প্রার্থী হিসেবে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে জয়ী হন এবং বিধায়ক নির্বাচিত হন। সেই সময় বিজেপি তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনিক মুখ হিসেবেও তুলে ধরে। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই, ১১ জুন ২০২১ তারিখে, তিনি নাটকীয়ভাবে পুনরায় তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে আসেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে তিনি তৃণমূলে যোগ দিলেও, প্রযুক্তিগতভাবে তিনি বিজেপির বিধায়ক হিসেবেই থেকে যান। মুকুল রায় তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরপরই বিজেপির পক্ষ থেকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তাঁর বিধায়ক পদ খারিজের দাবি তোলেন। ভারতের সংবিধানের দশম তফশিল (অ্যান্টি-ডিফেকশন ল) অনুযায়ী, আইনি জটিলতা আরও বাড়ে যখন মুকুল রায়কে বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি) চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। এই পদটি বিরোধী দলের কোনো সদস্যকে দেওয়া হয়। তৃণমূল দাবি করে, খাতায়-কলমে মুকুল রায় এখনো বিজেপি বিধায়ক, তাই তাঁকে এই পদ দেওয়া আইনত সঠিক। বিজেপি এর তীব্র বিরোধিতা করে এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। আদালত নির্দেশ দেয় যে বিধানসভার স্পিকারকে এই বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দীর্ঘ শুনানির পর বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় রায় দেন যে, মুকুল রায় বিজেপিতেই আছেন।
রাজনীতির বাইরে মুকুল রায়ের ব্যক্তিগত জীবন তুলনামূলকভাবে অনেকটাই আড়ালে। পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং স্বাস্থ্যের বিষয়েও তিনি বহুবার আলোচনায় এসেছেন। বিশেষ করে তাঁর শারীরিক অসুস্থতার খবর রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন তুলেছিল। রাজনীতির কঠিন মঞ্চের আড়ালে তিনি একজন আবেগপ্রবণ মানুষ, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী।
#MukulRoy #BengalPolitics #TrinamoolCongress #BJP #NewsOffBeat
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

