-৭১ ডিগ্রিতেও থমকায় না জীবন: বিশ্বের শীতলতম গ্রাম ওয়মিয়াকনের (Oymyakon) বেঁচে থাকার লড়াই। জানেন কি এই রহস্য │ Surving the coldest place on Earth
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: কল্পনা করুন এমন এক জায়গার কথা, যেখানে নিশ্বাস ছাড়লে তা বাতাসে মেশার আগেই বরফের স্ফটিকে পরিণত হয়। যেখানে স্রেফ ১৫ মিনিট খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালে আপনার নাক বা আঙুলে পচন (Frostbite) ধরতে পারে। আমরা কথা বলছি রাশিয়ার ইয়াকুতিয়া অঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম ওয়মিয়াকন (Oymyakon) সম্পর্কে। পৃথিবীর শীতলতম জনপদ হিসেবে পরিচিত এই গ্রামে শীতকালে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে -৭১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডাতেও কীভাবে প্রায় ৮০০ মানুষ ও পশুপাখি জীবন অতিবাহিত করছে, তা যে কোনো রূপকথাকেও হার মানায়।
যাতায়াত যখন যমদূত
মস্কো থেকে প্রায় ৭ ঘণ্টার বিমানযাত্রায় ইয়াকুটস্ক, আর সেখান থেকে ১৮ ঘণ্টার দুর্গম সড়কপথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় এই তুষাররাজ্যে। ওয়মিয়াকনে পৌঁছানো মানেই অন্য কোনো গ্রহে পা রাখা। এখানে বাতাস এত শুষ্ক যে শ্বাস নিতে গেলে নাকে অস্বস্তি হয় এবং অনবরত কাশি পায়। গ্রামটি পাহাড় দিয়ে ঘেরা একটি উপত্যকায় অবস্থিত হওয়ায় এখানে বাতাস বইতে পারে না, ফলে কনকনে ঠান্ডাটা স্থির হয়ে জেঁকে বসে থাকে। এখানকার মাটি বছরের পর বছর বরফে জমে থাকে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘পারমাফ্রস্ট’। কয়েকশ মিটার গভীর পর্যন্ত এই বরফ স্তর বিস্তৃত।
হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় ঘরকন্না
এত ঠান্ডায় জীবন বাঁচাতে এখানকার মানুষ বিশেষ স্থাপত্য কৌশল ব্যবহার করেন। ঘরগুলো মাটির ওপর সরাসরি না বানিয়ে মোটা কাঠের বিমের ওপর তৈরি করা হয়। দেয়ালগুলো হয় সাত স্তরের—বাইরে কাঠ, ভেতরে ইনসুলেশন হিসেবে ব্যাসাল্ট উল, প্লাস্টার এবং ফোমের স্তর। প্রতিটি বাড়িতে ট্রিপল গ্লেজড জানলা থাকে যাতে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা কোনোভাবেই বেরিয়ে না যায়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিটি বাড়ির প্রবেশপথের প্রথম ঘরটি ইচ্ছা করেই গরম করা হয় না। এই ঘরটি প্রাকৃতিক ফ্রিজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে দুধ বা মাংস খোলা অবস্থায় রেখে দিলেই তা পাথরের মতো জমে যায়। গ্রামের তাপমাত্রা যখন -৬০ ডিগ্রির নিচে থাকে, তখন আলাদা করে রেফ্রিজারেটরের কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। গোটা গ্রামকে গরম রাখতে একটি কেন্দ্রীয় কয়লা চালিত বয়লার চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করে যায়, যা পাইপের মাধ্যমে প্রতিটি ঘরে গরম জল ও তাপ পৌঁছে দেয়। এই সিস্টেম একবার বিকল হওয়া মানেই গোটা গ্রামের মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠা।
খাদ্যাভ্যাস ও বেঁচে থাকার রসদ
যেখানে এক ইঞ্চি জমিও চাষের যোগ্য নয়, সেখানে মানুষের প্রধান খাদ্য হলো মাংস ও মাছ। এখানকার বিখ্যাত ‘ইয়াকুট ঘোড়া’ এবং হরিণের মাংসই স্থানীয়দের শক্তির উৎস। এখানকার মানুষ ঘোড়ার মাংস এবং কলিজা কাঁচা ও হিমায়িত অবস্থায় নুন দিয়ে খান। তাঁদের বিশ্বাস, শাকসবজির অভাব মেটাতে এই কাঁচা মাংস থেকেই প্রয়োজনীয় ভিটামিন পাওয়া যায়। মাছ ধরার পদ্ধতিটিও বেশ রোমাঞ্চকর। জমে যাওয়া নদীর ওপর গর্ত খুঁড়ে জাল ফেলা হয়। জল থেকে মাছ তোলার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা বরফের মতো শক্ত হয়ে যায়। স্থানীয় শিকারিরা খরগোশ বা নেকড়ে শিকার করে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করেন।
আরও পড়ুন : সত্যি কি পূর্বজন্ম দেখা সম্ভব? নাকি পুরোটাই হিপনোটিজমের খেলা? জানুন বিশেষজ্ঞদের মতামত
পশুপাখির লড়াই
ওয়মিয়াকনের পশুরাও এই চরম আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। এখানকার বিশেষ জাতের খাটো ঘোড়াগুলো -৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে পারে। তাদের গায়ে চর্বির পুরু স্তর এবং ঘন লোম প্রাকৃতিক কম্বলের কাজ করে। তবে গরু সামলানো একটু কঠিন। সকালে গরুদের যখন জল খাওয়াতে নদীর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তাদের ওলান (Udder) যাতে জমে না যায়, তার জন্য বিশেষ কাপড়ের আবরণ পরিয়ে দেওয়া হয়।
জল মানেই সংগ্রামের নাম
শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, এই গ্রামে কোনো জলের পাইপলাইন নেই। কারণ পাইপের ভেতর জল মুহূর্তের মধ্যে জমে গিয়ে তা ফেটে যাবে। তাই পানীয় জল এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য স্থানীয়রা নদী থেকে বরফের বড় বড় চাঁই কেটে আনেন। সেই বরফের চাঙড়গুলো স্লেজ গাড়িতে করে বাড়িতে এনে গলিয়ে জল বের করা হয়। স্নান করা এখানে এক বিশাল উৎসবের মতো। স্নানের জল গরম করা থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা সময় লাগে, তাই এখানকার মানুষ সপ্তাহে একদিনই স্নান করেন।
যেখানে টয়লেট মানেই এক বিভীষিকা
আধুনিক নাগরিক জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এখানকার শৌচাগার। পাইপলাইন না থাকায় শৌচাগারগুলো বাড়ির বাইরে কাঠের কেবিনে তৈরি করা হয়। কনকনে ঠান্ডায় মাইনাস ৫০-৬০ ডিগ্রিতে বাইরে গিয়ে শৌচকর্ম করা স্রেফ যন্ত্রণাদায়ক নয়, বরং বিপজ্জনকও বটে। বর্জ্য পদার্থ বাইরে পড়ার সাথে সাথেই পাথরের মতো জমে স্তম্ভের আকার নেয়। যদিও বর্তমানে কিছু জায়গায় হিটারযুক্ত টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তবে দুর্গন্ধের কারণে সেগুলো ব্যবহার করা বেশ কষ্টকর।
স্কুল ও দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা
প্রচণ্ড শীতেও এখানে জীবন থেমে থাকে না। সকাল সাড়ে সাতটায় যখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলের জন্য তৈরি হয়, বাইরে তখনো ঘুটঘুটে অন্ধকার। তাপমাত্রা যতক্ষণ -৫৫ ডিগ্রির নিচে না নামছে, ততক্ষণ স্কুল বন্ধ হয় না। অর্থাৎ -৫০ ডিগ্রিতেও বাচ্চাদের স্কুলে যেতে হয়। একইভাবে, এখানকার গাড়িগুলো যদি কয়েক ঘণ্টা বাইরে ইঞ্জিন বন্ধ করে রাখা হয়, তবে তা পাথরের মতো জমে যায়। পরে ব্লো-টর্চ বা বিশেষ হিটার দিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা গরম করার পর তবেই গাড়ি স্টার্ট হয়।
ওয়মিয়াকন আমাদের শেখায় প্রকৃতি যতই নিষ্ঠুর হোক না কেন, মানুষের টিকে থাকার লড়াই তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। এখানে প্রকৃতিকে জয় করা নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে সন্ধি করেই বেঁচে আছেন এই অকুতোভয় মানুষগুলো।
Most Viewed Posts
- ‘মায়া ভরা রাতি’ আবার ফিরছে—অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে নতুন করে জেগে উঠবে এক চিরন্তন গান
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- মোটা হবেন না, মিষ্টি খান নিশ্চিন্তে │ Guilt-Free Sweets for Diwali Delight
- বাড়িতে রাখুন এই নয় গাছ, সৌভাগ্য ফিরবেই
- Dharmendra death: ধর্মেন্দ্রর জীবনের এই ১১টি তথ্য অনেকেই জানেন না │ 11 Untold Facts About Dharmendra

