PM Modi Gold Ban & WFH Appeal: মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রথম দিনেই ব্যস্ত কর্মসূচিতে শুভেন্দু অধিকারী। সল্টলেকের বিজেপি কার্যালয়ে সংবর্ধনা থেকে নবান্নে প্রশাসনিক ও পুলিশ বৈঠক— নতুন সরকারের প্রথম দিন ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জল্পনা।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: “আগামী এক বছর বাড়িতে যাই অনুষ্ঠান হোক, আমরা সোনার গয়না কিনব না— দেশহিতে আমাদের এই সংকল্প করতে হবে।”— দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে এমন একটি অনুরোধ শোনার পর সাধারণ মানুষের মনে রীতিমতো চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ভারতবর্ষের মতো একটি দেশে, যেখানে সোনা কেনা শুধু বিনিয়োগ নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) কেন এক বছরের জন্য সোনা কিনতে বারণ করছেন? এর পাশাপাশি দেশের কর্পোরেট এবং আইটি সেক্টরগুলোতে নতুন করে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ (Work From Home) বা বাড়ি থেকে কাজ করার পরিকাঠামো ফিরিয়ে আনার যে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, তা কি অশনিসংকেত?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, আমরা কি ফের ২০২০ সালের মতো কোনো বড়সড় লকডাউন বা চরম অর্থনৈতিক সংকটের দিকে এগোচ্ছি? নাকি এটি একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ঢাল? আবেগ সরিয়ে রেখে, সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা এই জোড়া পদক্ষেপের নেপথ্যের আসল কারণগুলোর বিশ্লেষণ করব।
বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে (Forex Reserve) চাপ এবং সোনার মোহ
যেকোনো দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তার বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বা ফরেক্স রিজার্ভ। বিদেশ থেকে যেকোনো জরুরি পণ্য (যেমন— তেল, ওষুধ, প্রযুক্তি) কিনতে গেলে ডলারের প্রয়োজন হয়। সম্প্রতি এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে (১ মে, ২০২৬ পর্যন্ত) ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ৭৭৯ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার থেকে হুড়মুড়িয়ে কমে গিয়েছে। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা! বর্তমানে দেশে ফরেক্স রিজার্ভ রয়েছে ৬৯,০৬৯ কোটি ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলার।
এই বিশাল পরিমাণ ডলার খরচের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভারতের অদম্য ‘সোনা-প্রীতি’। পৃথিবীতে সোনা কেনার ক্ষেত্রে ভারত একেবারে প্রথম সারিতে। প্রতি বছর এ দেশের মানুষ ৭০০ থেকে ৮০০ টন সোনা কেনেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভারতে সোনা উত্তোলিত হয় মাত্র এক থেকে দুই টন। অর্থাৎ, আমাদের প্রয়োজনীয় সোনার প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার খরচ করে আমদানি করতে হয়।
পরিসংখ্যান দেখলে চোখ কপালে উঠবে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারত ৫৮০০ কোটি ডলারের সোনা আমদানি করেছিল। আর ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তা একলাফে ২৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২০০ কোটি ডলারে! ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা। ভারত বিদেশ থেকে যত পণ্য আমদানি করে, তার ৯ শতাংশই হলো সোনা। অপরিশোধিত তেলের পরই সোনার স্থান। মুশকিল হলো, অপরিশোধিত তেল বা যন্ত্রপাতি আমদানি করলে দেশে কলকারখানা চলে, কর্মসংস্থান হয়। কিন্তু বিদেশ থেকে আমদানি করা সোনা স্রেফ মানুষের বাড়ির লকারে বা ব্যাঙ্কের ভল্টে গিয়ে জমা হয়। এর ফলে দেশের শিল্পোৎপাদনে কোনো সরাসরি প্রভাব পড়ে না, উল্টে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী ঠিক এই জায়গাতেই আঘাত করতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, “একসময়ে সংকটময় পরিস্থিতি বা যুদ্ধের সময় মানুষ দেশহিতে সোনা দান করে দিত। এখন দান করার দরকার নেই, শুধু এক বছর সোনা কেনা বন্ধ রাখুন, তাতেই বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে।”
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং তেলের দামের আগুন
সোনা আমদানির পাশাপাশি আরেকটি যে বিষয় ভারতের অর্থনীতিকে ভাবিয়ে তুলেছে, তা হলো আন্তর্জাতিক স্তরে অপরিশোধিত তেলের লাগামছাড়া দাম। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগ থেকে ইরান, আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের মধ্যে যে চরম সংঘাত শুরু হয়েছে, তা গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনীতিকে (Geopolitics) নাড়িয়ে দিয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ায় এই অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগর বা রেড সি-তে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হামলার কারণে আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থায় প্রবল বাধা সৃষ্টি হয়েছে। জাহাজগুলোকে এখন অনেক ঘুরপথে আসতে হচ্ছে, যার ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ (Freight cost) কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। স্বভাবতই ভারত, যারা তাদের প্রয়োজনীয় তেলের ৮৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে, তাদের ওপর এই বর্ধিত খরচের বিপুল চাপ পড়ছে। তেলের দাম বাড়লে দেশের ভেতরে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) চরম আকার ধারণ করে। সরকারকে তখন অতিরিক্ত ডলার খরচ করে বেশি দামে তেল কিনতে হয়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই সরকারকে কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
কেন ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর ইঙ্গিত? এর পিছনের আসল অংক কী?
প্রধানমন্ত্রীর সোনা না কেনার বার্তার পাশাপাশি বিভিন্ন মহলে ওয়ার্ক ফ্রম হোমের যে জল্পনা শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে কোনো মহামারির সম্পর্ক নেই। এর সম্পর্ক রয়েছে সরাসরি ‘তেল বাঁচানো’র সঙ্গে।
যদি দেশের বড় বড় শহরের কর্পোরেট অফিস, আইটি সেক্টর এবং এমন কিছু সরকারি দপ্তর— যেখানে সশরীরে উপস্থিত থাকার খুব একটা প্রয়োজন নেই, সেখানে কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে রাস্তায় লক্ষ লক্ষ গাড়ির যাতায়াত কমবে। লোকাল ট্রেন, বাস এবং প্রাইভেট গাড়ির ব্যবহার এক ধাক্কায় অনেকটা কমে গেলে দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের চাহিদাও বিপুলভাবে হ্রাস পাবে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি দুর্দান্ত ম্যাক্রো-ইকোনমিক (Macro-economic) কৌশল। একদিকে মানুষ সোনা কেনা কমালে বাঁচবে ডলার, অন্যদিকে ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু হলে অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমবে। এই দুইয়ের যুগলবন্দিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার আবার শক্তিশালী হতে শুরু করবে। অর্থাৎ, এটি কোনো নতুন সংকট ডেকে আনার ইঙ্গিত নয়, বরং আগামী দিনের সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সংকট বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও যাতে ভারতের অর্থনীতি মজবুত থাকে, তার জন্যই এই আগাম সতর্কতামূলক বা ‘প্রিভেন্টিভ’ পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা ভাবা হচ্ছে।
বাজার কী বলছে? আমদানির চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান
মজার বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী যখন এই কথা বলছেন, তখন দেশের সাধারণ মানুষ ও বাজার ইতিমধ্যেই তার প্রভাব দেখাতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সোনার দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়ায় আমদানিতে এমনিতেই বিরাট পতন লক্ষ্য করা গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারিতে বিদেশ থেকে প্রায় ১০০ টন সোনা আমদানি করেছিল ভারত। ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরুর পর তা কমে হয় ৬৫ থেকে ৬৬ টন। মার্চ মাসে তা আরও কমে দাঁড়ায় ২০ থেকে ২২ টনে। আর এপ্রিলে ভারত সোনা আমদানি করেছে মাত্র ১৫ টন! অতিমারি বা কোভিডের সময় ছাড়া গত ৩০ বছরে ভারতের সোনা আমদানি এতটা তলানিতে কখনও নামেনি। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ সোনার দামের এই ছ্যাঁকা খেয়ে এমনিতেই কেনাকাটায় রাশ টেনেছিলেন। এখন প্রধানমন্ত্রী চাইছেন, মানুষের এই সাময়িক অনীহা যেন একটি দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসে পরিণত হয়। কারণ, সামনেই বিয়ের মরশুম বা উৎসবের দিনগুলোতে মানুষ যদি আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে সোনা কেনেন, তবে এই পতনশীল আমদানির গ্রাফ আবার ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ওপর চাপ বাড়বে।
আগামী দিনের দিশা: ভয়ের কোনো কারণ আছে কি?
সাধারণ মানুষের মনে যে ভয়টি কাজ করছে— “বড় কোনো সংকট আসছে কি?” তার উত্তর হলো, সংকট ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে চলছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, ইউরোপের অস্থিরতা এবং ডলারের দামের ওঠানামা— এই সবকিছুই গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। ভারত যেহেতু গ্লোবাল ইকোনমির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই এর আঁচ আমাদের গায়েও লাগতে বাধ্য।
তবে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই বার্তা প্রমাণ করে যে কেন্দ্রীয় সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট সজাগ। তারা সমস্যার মূলে গিয়ে সমাধান করার চেষ্টা করছে। সোনা কেনা কমানো বা প্রয়োজনে ওয়ার্ক ফ্রম হোমের মতো নীতিগুলি হলো অর্থনৈতিক ঢাল। আপনার বাড়ির সঞ্চিত অর্থ যদি আপনি বিলাসবহুল গয়নায় আবদ্ধ না করে ব্যাঙ্ক, মিউচুয়াল ফান্ড বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন, তবে তা পরোক্ষভাবে দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের চাকাকেই ত্বরান্বিত করবে।
অতএব, প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদনকে কোনো আতঙ্কের চশমা দিয়ে না দেখে, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত।

