Sankar Bengali novelist: মণিশংকর মুখোপাধ্যায় প্রয়াত। তাঁর কলমে জন্ম নেওয়া ‘চৌরঙ্গী’ ও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন। প্রয়াত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়—যিনি শংকর নামে পরিচিত। বয়সজনিত দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৯২ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, সত্যিই কি বিদায় নিলেন তিনি? তাঁর সৃষ্টি, তাঁর চরিত্ররা, তাঁর শহর—আজও কি বেঁচে নেই আমাদের ভেতরে? তাঁর লেখা চৌরঙ্গী সেই বিরল কীর্তিগুলির অন্যতম। ১৯৬২ সালের ১০ জুন প্রথম প্রকাশের পর থেকেই উপন্যাসটি আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পায়। ১২৫টিরও বেশি সংস্করণ পেরিয়ে আজও বিশ্বজুড়ে পাঠকের চাহিদা তুঙ্গে। কেন একটি হোটেলকেন্দ্রিক গল্প ছয় দশক পরেও এত প্রাসঙ্গিক? কেন শাহজাহান হোটেলের লাল আলো আজও নিভে যায় না পাঠকের মনে? কেন তাঁর লেখায় বারবার ফিরে আসে মধ্যবিত্তের সংগ্রাম, উচ্চবিত্তের ভান, নিম্নবিত্তের বেঁচে থাকার লড়াই? এই প্রতিবেদনে খুঁজে দেখা হল সেই সব প্রশ্নের উত্তর।
শংকরের চোখে চৌরঙ্গী
শংকর তাঁর ‘চৌরঙ্গী’-তে কলকাতাকে দেখিয়েছেন বহুমাত্রিক এক চরিত্র হিসেবে। এখানে শহর নিছক পটভূমি নয়, শহর নিজেই নায়ক। শাহজাহান হোটেলের লবি যেন সমাজের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ—যেখানে ধনী ব্যবসায়ী, বিদেশি অতিথি, উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক, ক্লান্ত কর্মচারী—সবাই মিলেমিশে তৈরি করেছে এক নাট্যমঞ্চ। শংকরের লেখায় চৌরঙ্গী মানে আলোর ঝলকানি, আবার অন্ধকার গলি। সাফল্যের গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে ভাঙনের কান্না। তিনি দেখিয়েছেন—জীবন থেমে থাকে না। “শাজাহান হোটেলের লাল আলোগুলো তখনও জ্বলছে, নিভছে”—এই বাক্য যেন সময়ের প্রতীক। আলো নিভে যায়, আবার জ্বলে ওঠে—ঠিক শহরের মতোই।
কেন ‘চৌরঙ্গী’ এত জনপ্রিয় হয়েছিল?
বাস্তব অভিজ্ঞতার নির্যাস। শংকর নিজে হোটেল-জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে তাঁর বর্ণনা ছিল জীবন্ত, বিশ্বাসযোগ্য। চরিত্র নির্মাণ। স্যাটা বোসের মতো চরিত্র পাঠকের মনে স্থায়ী আসন গেড়েছে। সময়ের দলিল হিসেবে উপন্যাসটি অমূল্য। স্বাধীনতার পর বদলে যাওয়া কলকাতার সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখানে ধরা পড়েছে। পাঠক নিজের জীবনকে খুঁজে পেয়েছেন এই কাহিনিতে। আর এ কারণেই ‘চৌরঙ্গী’ শুধুমাত্র সাহিত্য নয়—এটি ইতিহাসও। এই জনপ্রিয়তার জেরেই উপন্যাসটি চলচ্চিত্রে রূপ নেয়। চৌরঙ্গী-তে উত্তম কুমার-এর অভিনয় উপন্যাসকে আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে দেয়।
শংকরের সাহিত্যজগৎ (Sankar Bengali novelist)
১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর যশোরে জন্ম। বাবা ছিলেন আইনজীবী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে পরিবার কলকাতায় চলে আসে। সেই শহরই পরে হয়ে ওঠে তাঁর সৃষ্টির প্রধান পটভূমি। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই কত অজানারে। প্রথম দিন থেকেই পাঠকমহলে সাড়া ফেলে দেয় বইটি। এক তরুণ লেখকের কলমে উঠে আসে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, ব্রিটিশ আমলের অফিস সংস্কৃতি এবং এক ভিন্ন জগতের দরজা। সেখান থেকেই শুরু শংকরের সাহিত্যযাত্রা—যা পরে হয়ে ওঠে এক বিস্তৃত মহাকাব্য।শুধু ‘চৌরঙ্গী’ নয়, শংকরের অন্যান্য উপন্যাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সীমাবদ্ধ-তে কর্পোরেট জগতের নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা, জন অরণ্য-তে বেকারত্ব ও যুবসমাজের হতাশা, ‘ঘরের মধ্যে ঘর’-এ পারিবারিক টানাপোড়েন—সব ক্ষেত্রেই তিনি তুলে ধরেছেন সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের সংগ্রাম। তাঁর লেখায় আমরা দেখি—উচ্চবিত্তের আড়ম্বরের আড়ালে শূন্যতা, নিম্নবিত্তের কঠোর বাস্তব, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও ভাঙনের দ্বন্দ্ব, তিনি কখনও কেবল অভিজাত সমাজকে নয়, সাধারণ মানুষের জীবনকেই কেন্দ্র করে গল্প বলেছেন। ফলে পাঠক তাঁর লেখায় নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছেন। ‘কত অজানারে’ মূলত আত্মজীবনীঘেঁষা রচনা। কলকাতা হাইকোর্টে এক ইংরেজ ব্যারিস্টারের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই এই উপন্যাসের জন্ম। বাস্তব চরিত্র, জীবন্ত সংলাপ ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে বইটি পাঠকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। এই উপন্যাসই প্রমাণ করে দেয়—শংকর শুধুমাত্র কাহিনিকার নন, তিনি একজন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক। মানুষের আচরণ, ক্ষমতার রাজনীতি, আত্মমর্যাদা—সবকিছু তিনি ধরতে পারতেন সহজ অথচ গভীর ভাষায়। শংকরের সাহিত্যজগৎকে পূর্ণতা দেয় তাঁর সমাজমনস্ক উপন্যাসগুলি। সীমাবদ্ধ-এ তিনি তুলে ধরেন কর্পোরেট দুনিয়ার নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নৈতিক আপসের গল্প। অন্যদিকে জন অরণ্য-তে দেখা যায় বেকার যুবকের অসহায়তা, সামাজিক চাপ এবং টিকে থাকার লড়াই।
এই দুই উপন্যাস অবলম্বনে কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ফলে সাহিত্য থেকে সিনেমা—দুই ক্ষেত্রেই শংকরের চিন্তাধারা পৌঁছে যায় বৃহত্তর দর্শকের কাছে। শুধু শহুরে বাস্তবতা নয়, শংকর আধ্যাত্মিক ধারাতেও সমান শক্তিশালী। তাঁর লেখা শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ রহস্যামৃত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে তিনি আধ্যাত্মিক ভাবনা ও ঐতিহাসিক অনুসন্ধানকে মিলিয়ে এক অনন্য রচনা নির্মাণ করেছেন। এছাড়া ‘ঘরের মধ্যে ঘর’, ‘সোনার সংসার’, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’, ‘তিরন্দাজ’ প্রভৃতি উপন্যাসে পারিবারিক সম্পর্ক, মানবিক টানাপোড়েন ও সামাজিক পরিবর্তনের নানা দিক উঠে এসেছে। শংকর মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের কথাকার। তবে তাঁর ক্যানভাস বিস্তৃত। কর্পোরেট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বেকার যুবক, গৃহিণী, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানী—সবাই তাঁর চরিত্রপুঞ্জে স্থান পেয়েছে।

চৌরঙ্গীর স্মৃতি অমলিন (Sankar Bengali novelist)
১৮শ ও ১৯শ শতকের কলকাতা ছিল ব্রিটিশ শাসনের রাজধানীস্বরূপ। সেই সময় ইউরোপীয়দের বিনোদনের জন্য গড়ে ওঠে একাধিক ইংরেজি নাট্যশালা। ক্যালকাটা থিয়েটার ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। ইউরোপীয় নাট্যরীতি, শেক্সপিয়রীয় অভিনয়, অপেরা—সব মিলিয়ে এক আলাদা সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হয়েছিল। চৌরঙ্গী থিয়েটারের প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। তিনি শুধু ব্যবসায়ী নন, ছিলেন সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকও। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা থিয়েটার প্রমাণ করে, বাঙালি অভিজাত সমাজও পাশ্চাত্য শিল্পচর্চায় কতটা আগ্রহী ছিল। স্বাধীনতার পর বহু রাস্তার নাম পরিবর্তিত হয়। চৌরঙ্গী রোডের নতুন নামকরণ হয় দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু-র নামে। চৌরঙ্গী মানে শুধু রাস্তা নয়—এ এক সময়ের প্রতীক। অফিসপাড়া, থিয়েটার, হোটেল, সাহিত্যচর্চা—সব মিলিয়ে এক সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ।
‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র স্যাটা বোস। এই চরিত্রটি শুধু একজন চিফ রিসেপশনিস্ট নন—তিনি পথপ্রদর্শক, অভিভাবক, আধুনিকতার প্রতীক। লেখক জানিয়েছেন, বাস্তব জীবনের কয়েকজন মানুষের ছায়া মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এই চরিত্র। স্যাটা বোসের স্মার্ট উপস্থিতি, সাবলীল ইংরেজি উচ্চারণ, অতিথি সামলানোর দক্ষতা—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন পাঠকের প্রিয়। তাঁর মধ্যে যেমন আত্মবিশ্বাস, তেমনই মানবিকতা। এই দ্বৈততা চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তোলে। পাঠক যেন নিজের জীবনের কোনো পরিচিত মানুষকে খুঁজে পান তাঁর মধ্যে। বাংলা সাহিত্যে এমন স্মরণীয় সাপোর্টিং চরিত্র খুব বেশি নেই, যারা নায়ক না হয়েও গল্পের প্রাণ হয়ে ওঠেন। স্যাটা বোস সেই বিরল উদাহরণ।
উপন্যাসের বিপুল জনপ্রিয়তার পর খুব দ্রুতই তা সিনেমায় রূপ নেয়। চৌরঙ্গী ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন উত্তম কুমার। তাঁর উপস্থিতি ছবিটিকে অন্য মাত্রা দেয়। সাহিত্যপ্রেমী থেকে সাধারণ দর্শক—সবাই মুগ্ধ হন।,ছবিটি সুপারহিট হয় এবং উপন্যাসের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীকালে পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় ‘শাজাহান রিজেন্সি’ নামে আধুনিক প্রেক্ষাপটে গল্পটি নতুনভাবে নির্মাণ করেন। সময় বদলায়, চরিত্রের পোশাক বদলায়, কিন্তু মূল সুর একই থাকে—মানুষের সম্পর্ক, স্বপ্ন আর ভাঙনের গল্প। এইভাবে ‘চৌরঙ্গী’ সাহিত্য থেকে সিনেমা, আবার নতুন প্রজন্মের পর্দায়—প্রতিটি মাধ্যমে নিজেকে পুনর্জন্ম দিয়েছে।
‘চৌরঙ্গী’ (Sankar Bengali novelist) শুধু বাংলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইংরেজি অনুবাদ করেন অরুণাভ সিনহা। সেই অনুবাদ আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়। চৌরঙ্গী মানে এক বহমান শহর। থিয়েটারের আলো, হোটেলের লবি, সাহিত্যিকের কলম—সব একসূত্রে বাঁধা। নাম বদলায়, সময় এগোয়, মানুষ চলে যায়—তবু গল্প থেকে যায়। শংকরের প্রয়াণে এক অধ্যায়ের অবসান হলেও তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা আজও বেঁচে আছে। চৌরঙ্গী তাই শুধু একটি উপন্যাস নয়—এ শহরের আত্মপরিচয়।
নিউজ অফবিটের পক্ষ থেকে প্রয়াত সাহিত্যিকের প্রতি রইল আমাদের প্রণাম, তার পরিবারের প্রতি রইল সমবেদনা।
#SankarBengaliNovelist, #Sankar, #ManiShankarMukherjee, #BengaliLiterature, #Chowringhee
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

