Sepsis from dog lick: পোষ্য কুকুরের লালা করতে পারে আপনার অঙ্গহানি। এক নারীর চার অঙ্গ হারানোর ঘটনার আলোকে জানুন সেপসিসের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: প্রতিদিনের মতোই অফিস থেকে ফিরলেন। দরজা খুলতেই লেজ নেড়ে ছুটে এল আপনার আদরের পোষ্য। আপনি ক্লান্ত শরীরে বসতেই সে লাফিয়ে উঠল কোলে, মুখে মুখ ঘষে আদর চাইলো। আপনি হাসলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, হয়তো ছোট্ট একটা চুমুও খেলেন।
কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন—এই নির্দোষ ভালোবাসার মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে অদৃশ্য বিপদ? সামান্য একটা কাটা বা আঁচড়, যেটাকে আপনি গুরুত্বই দেননি, সেখান দিয়েই যদি শরীরে ঢুকে পড়ে মারাত্মক জীবাণু? আদরের স্পর্শ কি কখনও হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুফাঁদ? মাত্র এক দিনের ব্যবধানে জীবন আমূল বদলে যেতে পারে—এমন ভয়াবহ বাস্তবের সাক্ষী হলেন ব্রিটেনে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী মনজিত সাঙহা। গত বছরের জুলাই মাসে সামান্য অসুস্থতা নিয়ে বাড়ি ফেরার পরের দিনই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। শরীর ঠান্ডা, ঠোঁট বেগুনি, শ্বাসকষ্ট—চিকিৎসকেরা পরে জানান, এটি ছিল ভয়ংকর সংক্রমণজনিত অবস্থা, যা দ্রুত রক্তে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তাঁর দুই পা ও দুই হাত কেটে ফেলতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সামান্য কাটা বা আঁচড়ে পোষা কুকুরের লালা থেকে জীবাণু রক্তে ঢুকেই এই বিপর্যয় ঘটায়।
ব্রিটেনের স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ এই সংক্রমণজনিত জটিলতায় প্রাণ হারান। অথচ প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ জ্বর বা দুর্বলতার মতোই মনে হয়। এই প্রতিবেদনে আপনারা জানবেন কী কারনে সংক্রমণ হয়েছিল? সেপসিস কী, কেন হয়, তার লক্ষণ এবং কীভাবে তার চিকিৎসা সম্ভব।
ঘটনাটি কীভাবে ঘটল
জুলাই মাসের এক সন্ধ্যায় কাজ সেরে বাড়ি ফিরেছিলেন মনজিত। পরদিন সকালে তিনি অচেতন। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাঁকে উলভারহ্যাম্পটনের New Cross Hospital-এ নিয়ে যান। নিবিড় পরিচর্যা কক্ষে ভর্তি করা হয়। কয়েকবার হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় চিকিৎসকেরা বাধ্য হয়ে দুই পা হাঁটুর নীচ থেকে এবং দুই হাত কেটে ফেলেন। চিকিৎসকদের ধারণা, কুকুরের লালায় থাকা এক ধরনের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়। এই জীবাণু প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর না হলেও মানুষের শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে রক্তচাপ হঠাৎ নেমে যায়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকেজো হতে শুরু করে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।মনজিতের দীর্ঘ বত্রিশ সপ্তাহের লড়াই শেষে বাড়ি ফেরা নিঃসন্দেহে অলৌকিক প্রত্যাবর্তন। তবে তাঁর এই ঘটনা আমাদের সতর্কবার্তা দেয়—সেপসিসকে হালকাভাবে নিলে চলবে না।
সেপসিস কী?
সেপসিস হল এমন একটি প্রাণঘাতী অবস্থা, যখন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নিজ শরীরের সুস্থ কোষ ও অঙ্গকে আক্রমণ করতে শুরু করে। অর্থাৎ সংক্রমণ মোকাবিলার লড়াই অতিরিক্ত তীব্র হয়ে গিয়ে সারা শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে। ফলে রক্তচাপ কমে যায়, রক্ত সঠিকভাবে অঙ্গগুলিতে পৌঁছাতে পারে না। এই অবস্থাকে কখনও কখনও সংক্রমণজনিত শকও বলা হয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে—যেমন কিডনি, ফুসফুস, যকৃত। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপসিস নিজে কোনও সংক্রমণ নয়; বরং সংক্রমণের জটিল ও বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া। তাই সংক্রমণ যত দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেপসিসের ঝুঁকি তত কমে।
সেপসিস সাধারণত ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ থেকে বেশি হয়। তবে ছত্রাক, ভাইরাস বা পরজীবী সংক্রমণ থেকেও হতে পারে। কিছু সাধারণ উৎস হল—শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, বিশেষ করে নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ, পেটের ভেতরের সংক্রমণ, যেমন অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যাওয়া, ত্বকের সংক্রমণ বা ক্ষতস্থানে জীবাণু প্রবেশ, মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্রের সংক্রমণ। মনজিতের ক্ষেত্রে সন্দেহ করা হচ্ছে, কুকুরের লালা একটি ছোট ক্ষতের মাধ্যমে রক্তে ঢুকে সংক্রমণ ঘটায়। অর্থাৎ ক্ষত যতই ছোট হোক, পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সেপসিসের উপসর্গ
সেপসিসের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ অসুস্থতার মতো শুরু হয়। কিন্তু দ্রুত তীব্র হয়ে ওঠে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ—
- খুব বেশি জ্বর বা অস্বাভাবিকভাবে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
- শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস
- হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়া
- বিভ্রান্তি, অস্পষ্ট কথা বলা
- ত্বকে লালচে বা বেগুনি দাগ
- প্রস্রাব কমে যাওয়া
- তীব্র ব্যথা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা
এই উপসর্গগুলির একাধিক একসঙ্গে দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ সেপসিসে সময়ই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর—প্রতি ঘণ্টার দেরি বিপদ বাড়ায়।

সেপসিস হলে কীভাবে চিকিৎসা সম্ভব
যেকোনও কাটা বা আঁচড় দ্রুত পরিষ্কার করে জীবাণুমুক্ত করুন। দীর্ঘদিন জ্বর বা সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন। টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা করবেন না, সংক্রমণের লক্ষণ হালকাভাবে নেবেন না।
মনজিত সাঙহার জীবনের এই ভয়াবহ অধ্যায় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—সেপসিস বিরল হলেও অত্যন্ত বিপজ্জনক। সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসাই পারে প্রাণ বাঁচাতে। সামান্য ক্ষত, সামান্য জ্বর—কখনও কখনও তার আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে বড় বিপদ। আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ যদি সংক্রমণের অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখেন, দেরি করবেন না। পোষ্য প্রাণী আমাদের পরিবারেরই অংশ। তাদের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, তাদের উপস্থিতি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তবুও বাস্তবতা হল—প্রাণীর শরীরে এমন কিছু জীবাণু থাকতে পারে যা তাদের ক্ষতি না করলেও মানুষের শরীরে গুরুতর সংক্রমণ ঘটাতে পারে। তাই আদর, স্নেহ ও ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেও কিছু সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
হাত-পা বা শরীরের কোথাও কাটা, আঁচড় বা ঘা থাকলে তা ভালোভাবে পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখুন। পোষ্য যেন সেই জায়গায় চেটে না দেয়। সামান্য ক্ষত থেকেও জীবাণু রক্তে প্রবেশ করতে পারে। অনেকেই আদরের বশে পোষ্যকে মুখে চুমু খান বা পোষ্য মুখ চেটে দেয়। এটি এড়ানো উচিত। বিশেষ করে চোখ, নাক, মুখ বা ক্ষতস্থানে প্রাণীর লালা লাগা বিপজ্জনক হতে পারে। পোষ্যকে আদর করার পর, খাবার দেওয়ার পর বা তাদের পরিষ্কার করার পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন। শিশুদেরও এই অভ্যাস শেখান। ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ভোগা ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ বা ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তাদের খোলা ক্ষত থাকলে পোষ্যের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ এড়ানো ভালো।
পোষ্যকে ভালোবাসা মানেই দূরে সরিয়ে রাখা নয়। বরং সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই সঠিক পথ। একটু সতর্ক থাকলে পোষ্যের সঙ্গও উপভোগ করা যাবে, আবার সংক্রমণের ঝুঁকিও অনেকটাই কমানো সম্ভব। ভালোবাসা থাকুক, সঙ্গে থাকুক সচেতনতা।
#PetSafety,#SepsisAwareness, #HealthAlert, #PetLovers, #PublicHealth, #HealthNews
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

