Shapoorji Water Crisis,: নিউটাউনের সাপুরজি আবাসনে ৪ দিন পরেও কাটেনি জলসঙ্কট। জলে কোলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া, ঘরে ঘরে ডায়রিয়া। রমজানে চার তলায় বালতি বইছেন অসুস্থরা। পড়ুন এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: স্মার্ট সিটির বুকে এক বালতি জলের হাহাকার! সাপুরজিতে ৪ দিন পরেও মেলেনি সুরাহা, ক্ষোভে ফুঁসছেন বাসিন্দারা শহরের নাম নিউটাউন। স্মার্ট সিটি। চারদিকে কাঁচের বহুতল আর আইটি হাবের ঝলকানি। অথচ এই শহরের বুকেই মাথা উঁচু করে থাকা সাপুরজি সুখবৃষ্টি আবাসনের চিত্রটা এখন একেবারেই অন্যরকম। সেখানে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এক বালতি জলের জন্য মানুষের করুণ আকুতি। টানা চারদিন কেটে গিয়েছে রবিবার রাতের সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণের পর। কিন্তু পরিস্থিতির ছিটেফোঁটা বদল হয়নি। বরং মানুষের হয়রানি আর কষ্ট যেন আরও বহুগুণ বেড়েছে।
আবাসনের ই-ব্লকের ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করা হয়েছে ঠিকই। নতুন জলও এসেছে। কিন্তু সেই জল এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক চরম প্রহসন। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর (PHE) এবং মেইনটেন্যান্স কর্তৃপক্ষের তরফে স্পষ্ট নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই জল শুধুমাত্র টয়লেট বা ফ্লাশ করার কাজে ব্যবহার করা যাবে। কোনওভাবেই এই জল খাওয়া, রান্না করা, দাঁত মাজা বা স্নানের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। আমাদের হাতে আসা একটি ভিডিওতেও দেখা যাচ্ছে, পুলিশের উপস্থিতিতেই এক আধিকারিক এই নির্দেশিকা পড়ে শোনাচ্ছেন এবং বারবার সতর্ক করছেন।
ফলে শুরু হয়েছে এক নতুন মাত্রার লড়াই। স্নানের জল থেকে শুরু করে বাসন ধোয়ার জল—সবটাই এখন নিচ থেকে বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। রমজান মাস চলছে। উপবাস করে এমনিতেই শরীর দুর্বল থাকে। এক বাসিন্দা রেজিনা বিবি চরম ক্ষোভ আর হতাশার সঙ্গে জানালেন তাঁর করুণ অবস্থার কথা। রোজার উপবাস করে এই দুর্বল শরীরে বালতি করে চার তলায় জল তুলে নিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে। কারণ তাঁর ব্লকে কোনও লিফট নেই। লিফট বিহীন ফ্ল্যাটে অসুস্থ ও দুর্বল শরীরে এই অমানবিক হয়রানি মেনে নিতে পারছেন না কেউই।
নিউটাউনের সাপুরজি সুখবৃষ্টি আবাসনের ই-ব্লকে পানীয় জলে ভয়াবহ দূষণ।
প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গিয়েছে, রিজার্ভারের জলে মারাত্মক মাত্রায় কোলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া মিলেছে। এই দূষিত জল থেকেই ডায়রিয়া এবং পেটের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন তিনশোর বেশি মানুষ। ই-ব্লকে রীতিমতো স্বাস্থ্য শিবির করে চিকিৎসকরা অসুস্থদের দেখছেন, জরুরি অবস্থার জন্য রাখা হয়েছে অ্যাম্বুল্যান্সও। কিন্তু বুধবারের চিত্রটা ছিল আরও ভয়াবহ। সেদিন সারাদিন আন্ডারগ্রাউন্ড এবং ওভারহেড রিজার্ভার ডিপ-ক্লিনিং বা পরিষ্কারের জন্য ট্যাঙ্কে এক ফোঁটা জল ছিল না। বহু মানুষের শরীর এতটাই খারাপ যে বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা নেই। অথচ পেটের মারাত্মক সমস্যার কারণে তাঁদের বারবার টয়লেটে যেতে হচ্ছে। সেই চরম অসুস্থ অবস্থায় তিন তলা বা চারতলা থেকে নেমে বালতি করে বারবার জল নিয়ে যেতে হয়েছে বাসিন্দাদের।
বুধবার সারাদিন ই-ব্লকের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ভেসে উঠেছে একের পর এক করুণ আর্তি। “অনুগ্রহ করে আমার ফ্ল্যাটে এক বালতি জল পৌঁছে দিন”—এমন মেসেজে ভরে গিয়েছিল গ্রুপ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই বিপদের দিনে সাপুরজি কর্তৃপক্ষের কাউকেই পাশে পাওয়া যায়নি। শেষমেশ প্রতিবেশীরাই একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসেন।
বৃহস্পতিবার সকালে কমপ্লেক্সের গেটে দেখা গেল অন্য ছবি। মহিলা ও পুরুষ পুলিশ মোতায়েন রয়েছে চারদিকে। যেন কোনও অপরাধমূলক এলাকা। এনকেডিএ (NKDA), স্থানীয় বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায় এবং পুলিশের একাধিক আশ্বাসের পরেও সমস্যার পুরোপুরি সুরাহা হয়নি। কর্তৃপক্ষ এখন বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগবে। জলের হাহাকার মেটাতে এনকেডিএ-র তরফ থেকে কিছু জলের গাড়ি পাঠানো হয়েছে ঠিকই। বিধায়কের উদ্যোগেও বাসিন্দাদের মিনারেল ওয়াটার দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ফ্ল্যাটের সংখ্যার অনুপাতে এই জল যৎসামান্য। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর সংসারের কাজের জন্য এইটুকু জল কি যথেষ্ট? পাম্প অফিস থেকে এদিন রীতিমতো হুমকির সুরে জানিয়ে দেওয়া হয়, এক বোতলের বেশি জল দেওয়া হবে না। ফ্রিতে পাচ্ছেন এটাই যথেষ্ট, এরপর দরকার হলে কিনে খান।
কেন এত বড় একটি আবাসনের এই হাল? এর পেছনের আসল কারণটি তুলে ধরলেন সুব্রত চক্রবর্তী নামের এক বাসিন্দা। তাঁর মতে, এই কমপ্লেক্সের বেশিরভাগ ফ্ল্যাটের মালিকেরা এখানে থাকেন না। তাঁরা ব্রোকারকে চাবি দিয়ে নিশ্চিন্তে আছেন। আর যারা ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকেন, মেইনটেন্যান্স কর্তৃপক্ষ তাঁদের মানুষ বলেই গণ্য করে না। কোনও অভিযোগ জানাতে গেলেই প্রথম প্রশ্ন ধেয়ে আসে, “আপনি ভাড়াটিয়া না ওনার?” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বাসিন্দার গলাতেও একই সুর। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, পুলিশও যেন কর্তৃপক্ষের পাশেই দাঁড়িয়েছে। তাঁরা বাইরের মানুষ, তাই তাঁদের কথায় কোনও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
শুধু জলের সমস্যা নয়। এই সুযোগে ই-ব্লকের আরও অনেক অব্যবস্থাপনার ছবিও সামনে আসছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, কমপ্লেক্স ঠিকমতো পরিষ্কারই হয় না। খাতায় কলমে সপ্তাহে দুদিন পরিষ্কার করার কথা। কিন্তু বাস্তবে মাসে একদিনও ঠিকমতো সাফাই হয় না। চারদিকে যত্রতত্র পড়ে থাকে কুকুরের মল। দুর্গন্ধে টেকা দায়।
তবে এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। তা হলো বাসিন্দাদের একতা। মেইনটেন্যান্স কর্তৃপক্ষের উপর ভরসা হারিয়ে এবার নিজেদের সোসাইটি গঠন করার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। যে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটি মাত্র ২০ জন আবাসিক নিয়ে শুরু হয়েছিল, এই কদিনে তা বেড়ে ৫০০ জনে দাঁড়িয়েছে। সকলের এখন একটাই লক্ষ্য—নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া। নিজেদের মতো করে সোসাইটি তৈরি করে এই অরাজকতার অবসান ঘটানো।
স্মার্ট সিটির কর্পোরেট কর্তারা হয়তো এসি ঘরে বসে ভাবছেন জল দিলেই সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন একবার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে ঘুরে দাঁড়ায়, তখন সেই প্রতিবাদের আগুন নেভানো এত সহজ হয় না। সাপুরজির ই-ব্লক এখন সেই আগুনেই ফুঁসছে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

