Value Bengali Story: রতন-মালতীর গল্পে উঠল জীবনের কঠিন সত্য, অন্যের স্বপ্নের বাড়ি বানায় রতন, নিজের ঘরেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি—তবু কোন জিনিসের মূল্য সবচেয়ে বেশি? রতনের জীবনের গল্প শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে? লিখেছেন ড. সুস্মিতা প্রামাণিক
রতন মিস্ত্রি বারো বছর ধরে বহুতল বাড়ি বানায়।
এই শহরের যে নতুন ঝকঝকে কমপ্লেক্সটা হয়েছে – ‘স্মার্ট হোমস, স্মার্ট লিভিং’ তার চারতলার টাইলসটা রতন নিজের হাতে বসিয়েছে। মালিক এসে বলেছিল, এই টাইলসটার দাম নাকি তিন হাজার টাকা পার স্কয়ার ফিট। ইতালি থেকে এসেছে।
রতন মাথা নেড়েছিল। তিন হাজার টাকা! সে দিনে পায় সাতশো টাকা।
উদ্বোধনের দিন রতন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। ভিতরে আলো, গান বাজছে। দারোয়ান এসে সটান বলে দিল, “ভাই, পরে আসবেন। ভিতরে এখন কাস্টমাররা আছেন।”
রতন কিছু বলল না। তার অভ্যেস আছে।
সে বাড়ি ফিরে এল। ডায়মন্ড হারবারের ভেতরের দিকে তার ঘর। টিনের চাল, মাটির দাওয়া।
তার বউ মালতী দাওয়ায় বসে চাল বাছছে। সারাদিনের রোদে তার মুখটা শুকিয়ে আছে।
মালতী রতনের মুখ দেখেই বুঝল।
-‘আবার ঢুকতে দেয়নি, তাই তো?’
রতন চুপ করে বালতির জলে হাত ধুলো। মালতী বলল, ‘তুমি যে এত যত্ন করে ওদের ঘর বানাও, ওরা একবার তোমার ঘরটা দেখতে আসতে পারে না? এই চালটা দিয়ে গত শ্রাবণে তিন জায়গা দিয়ে জল পড়ছিল। তুমি বলেছিলে “এবার সারাব।”
রতন বলল, ‘সারাবো। এই কাজটার টাকাটা পেলেই সারাবো।’
মালতী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার রাগ হয় না, অভিমান হয়। সে জানে তার স্বামী ফাঁকি দেয় না। যে মানুষ অন্যের ঘরের টাইলসের কোণা মিলিয়ে বসায়, সে নিজের ঘরের ফুটো বন্ধ করতে পারে না – এটাই তার কষ্ট।
-‘জানো,’ মালতী চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘আমি আজ হাটে গিয়েছিলাম। নতুন চাল উঠেছে। দোকানি বলল ষাট টাকা কেজি। আমি এক কেজি নিলাম। যে মানুষগুলো মাঠে ধান ফলায়, তাদের ঘরেই চালের হিসাব করতে হয়, এটা কেমন নিয়ম বলো তো? আমাদের বলো অন্নদাতা, কিন্তু আমাদের থালাতেই অন্ন কম পড়ে।’
পাশের বাড়ির বিমলা কাকিমা তখন বেড়ার ওপাশ থেকে ডাকল।
‘ও মালতী, তোদের উনুনে একটু আঁচ আছে? আমার উনুনটা আজ নিভে গেছে।’
মালতী তাড়াতাড়ি বলল, “আছে কাকিমা , কি রান্না করবে করে নিয়ে যাও।”
এই পাড়ায় এখনও এটাই নিয়ম। একজনের উনুন নিভে গেলে আরেকজনের থেকে আঁচ নেয়। একজনের বাচ্চা কাঁদলে আরেকজন এসে কোলে নেয়। শহরের স্মার্ট বিল্ডিংয়ে হয়তো এই নিয়মটা নেই। সেখানে সবাই নিজের দরজা বন্ধ করে থাকে।
বিমলা কাকিমা আধসেদ্ধ ভাতটা সেদ্ধ করে নিতে নিতে বলল, “শুনলাম রতন নাকি সাহেবদের বড় ফ্ল্যাট বানিয়েছে? তা তোদের জন্য একটা ফ্ল্যাট দিল না?”
মালতী হাসল। বললো, ‘ তুমি হাসালে। আমরা ফ্ল্যাটে থাকলে তোমার সাথে এইভাবে আঁচ দেওয়া-নেওয়া হবে কী করে কাকিমা ?’
বিমলা কাকিমা হাসতে হাসতে চলে গেল। কিন্তু তার কথাটা মালতীর মনে লেগে রইল।
সন্ধ্যায় তাদের ছেলে টুবাই ফিরল। টুবাই কলেজ পাশ করে দু বছর ধরে চাকরি খুঁজছে। মোবাইলে সারাদিন নানা ভিডিও দেখে – সাত দিনে সফল হওয়ার উপায়, ঘুম থেকে উঠে পাঁচটি কাজ।
টুবাই এসে বলল, ‘বাবা, ওই কমপ্লেক্সে সিকিউরিটি গার্ডের একটা কাজ আছে। বারো ঘণ্টা ডিউটি, আট হাজার টাকা।’
রতনের বুকটা ধক করে উঠল। সে যে বাড়িটা বানালো, সেই বাড়ির গেটেই তার ছেলে পাহারা দেবে?
মালতী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘করবি না বাবা। তুই যে বাড়িটা বানাসনি, সেই বাড়ির গেটে দাঁড়াবি কেন? তুই অন্য কিছু কর।’
টুবাই রেগে বলল, ‘অন্য কী করব মা? পাড়ার সবাই জিজ্ঞেস করে – কী করছিস? চাকরির চেষ্টা করছি বললে বলে – কিছু হলো? এই ‘কিছু হলো’ শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত।’
পাড়ার মোড়ের চা দোকানে রতনরা বসে। সেখানে সবাই আসে। ভ্যানচালক, রাজমিস্ত্রি, এক প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারমশাই।
মাস্টার বলল, ‘রতনদা, তুমি তো জানো, আমার স্কুলে দুটো বাচ্চা আছে। একই মেধা। একজনের বাবা তাকে প্রাইভেট টিউটর, কম্পিউটার সব দেয়। আরেকজনের বাবা তোমার মতো মাঠে কাজ করে। দৌড় শুরু হওয়ার আগেই একজনের পায়ে জুতো, আরেকজনের পায়ে কাঁটা। তারপর আমরা বলি মেধার জয় হলো।’
সবাই চুপ করে থাকে। চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেয়।
রাতে বৃষ্টি নামল। টিনের চালের ফুটো দিয়ে জল পড়ছে। মালতী একটা বালতি, একটা গামলা পেতে দিল। টুবাই তার পুরোনো ফোনটা নিয়ে বসে আছে, কিন্তু আজ আর সাফল্যের ভিডিও দেখছে না। সে বাবার পাশে বসে আছে।
মালতী বলল, ‘মানুষটা সারাদিন রোদে পুড়ে অন্যের ঘর বানায়, আর নিজের ঘরের জল আটকাতে পারে না। ‘
রতন বালতিতে পড়া জলের শব্দ শুনতে শুনতে মালতী কে বলল, ‘ আজ ওই বড় বাড়ির মালিক বলছিল, সবকিছু স্মার্ট হতে হবে। স্মার্ট ফোন, স্মার্ট টিভি। আমি ভাবছিলাম, সবকিছু স্মার্ট হলো, শুধু আমি মানুষটাই আর স্মার্ট হতে পারলাম না। মানুষ আর মানুষের খবর রাখে না। পাশের বাড়ির লোকটা ভাত খেল কিনা, কেউ জিজ্ঞেস করে না।’
টুবাই হঠাৎ বলে বসল, ‘বাবা, আমাদের এই টিনের চালের ফুটো দিয়ে যে চাঁদের আলোটা আসছে, ওটার দাম কত?’
মালতী অবাক হয়ে তাকাল। রতন হাসল।
মালতী বলল, ‘ওটার কোনো দাম নেই রে বাবা। ওটার মূল্য আছে। দাম দিয়ে ফ্ল্যাট কেনা যায়, গাড়ি কেনা যায়। কিন্তু এই যে আমরা তিনজনে একসাথে বসে জল পড়া দেখছি, বিমলা কাকিমা আঁচ নিতে আসছে, তোর বাবা সারাদিন পর ঘরে ফিরছে – এগুলোর কোনো দাম হয় না রে । এগুলোর মূল্য হয়।’
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার। চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টি ফোঁটা গামলা আর বালতির ওপর একঘেয়ে ও বিরক্তিকর ভাবে পড়েই চলেছে।
বাজারে সবকিছুর দাম লেখা আছে। শুধু এই ছোট্ট টিনের ঘরের ভিতরের যে মায়া, যে অপেক্ষা, যে ভাগ করে নেওয়া – তার কোনো দাম লেখা নেই কোনো বোর্ডে।
বৃষ্টির তোড় বেড়ে চলেছে সঙ্গে ফুটো চাল থেকে টিনের গামলার ওপর পড়া বৃষ্টির জলের ছন্দছাড়া শব্দ টাও ..
টিপ..
টিপ টিপ টিপ ..
টিপ টিপ
মালতী স্টোভ ধরিয়ে লাল চা বসালো।
#ValueBengaliStory
#BengaliShortStory
#BengaliHumanStory
সাম্প্রতিক পোস্ট
স্কুলের শৌচাগারে সাপ! নামী বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা নিয়ে উঠল প্রশ্ন, কী বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে আসল কারণ কী? ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
অভিজিৎ দীপকে কি তবে এবার বিজেপিতে? রাজনৈতিক প্রস্তাব ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা
ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, হাইকোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পদক্ষেপ কী?

