Vedic students in BTech: এআইসিটিই-র যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত—এখন থেকে বৈদিক বোর্ডের ছাত্রছাত্রীরাও সরাসরি ভর্তি হতে পারবে বি.টেক কোর্সে। শিক্ষামহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক, কেউ দেখছেন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত, কেউ বা মানের অবনমনের আশঙ্কা।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক, নয়াদিল্লি: দৃশ্যপট ১: একটি শান্ত তপোবন। ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয়ে যায় বেদপাঠ। গুরু ও শিষ্যের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় হাজার বছরের পুরনো শ্লোক। এখানে শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো স্মৃতিশক্তি, শ্রুতি এবং সঠিক উচ্চারণ। এখানে ছাত্ররা শেখে কীভাবে শব্দের তরঙ্গে মহাবিশ্বের সত্যকে খুঁজতে হয়।
দৃশ্যপট ২: একটি ঝকঝকে আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। ল্যাবরেটরিতে জটিল যন্ত্রপাতির সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্রছাত্রীরা। তাঁদের মগজাস্ত্রে শান দিচ্ছে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং গণিতের জটিল সমীকরণ। এখানে শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান।
এতদিন মনে করা হতো, এই দুটি জগত সম্পূর্ণ আলাদা। এদের চলার পথ সমান্তরাল, কখনো মেলার নয়। কিন্তু ভারতের কারিগরি শিক্ষার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকনিক্যাল এডুকেশন (AICTE), সেই ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। তারা এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে বৈদিক শিক্ষার আঙিনা থেকে সরাসরি আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার রাস্তা খুলে দিয়েছে।
এআইসিটিই দেশের সমস্ত অনুমোদিত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে—যার সংখ্যা প্রায় ৯০০০—নির্দেশ দিয়েছে যে, এখন থেকে প্রথাগত বৈদিক শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা ছাত্রছাত্রীদেরও সিবিএসই (CBSE), আইসিএসই (ICSE) বা অন্যান্য রাজ্য বোর্ডের ছাত্রছাত্রীদের মতোই সমমর্যাদা দিতে হবে। অর্থাৎ, বৈদিক শিক্ষায় শিক্ষিতরাও এখন বি.টেক কোর্সে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন।
এই সিদ্ধান্ত কি শুধুই একটি প্রশাসনিক নিয়ম বদল? নাকি এর পেছনে রয়েছে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে এক নতুন ছাঁচে গড়ার গভীর পরিকল্পনা? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষাবিদদের মনে। শুরু হয়েছে এক তুমুল বিতর্ক—একদিকে ভারতীয় জ্ঞানব্যবস্থার (Indian Knowledge Systems) সমর্থকরা, অন্যদিকে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রবক্তারা।
নতুন নির্দেশিকা: সহস্রাব্দের ব্যবধান ঘোচানোর চেষ্টা
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এআইসিটিই-র জারি করা একটি সাম্প্রতিক সার্কুলার। দেশের সমস্ত কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কাছে পাঠানো এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ‘মহর্ষি সন্দীপনি রাষ্ট্রীয় বেদবিদ্যা প্রতিষ্ঠান’ (MSRVSSB) থেকে পাস করা ছাত্রছাত্রীদের মূল স্রোতে আনতে হবে। MSRVSSB হলো কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনস্থ একটি সংস্থা, যার কাজ হলো ঐতিহ্যবাহী বৈদিক শিক্ষার সংরক্ষণ ও প্রসার। এই বোর্ড যে সার্টিফিকেটগুলি প্রদান করে, সেগুলিকে এখন আধুনিক স্কুল শিক্ষার সমতুল্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে: বেদ ভূষণ: দশম শ্রেণির সমতুল্য। বেদ বিভূষণ: দ্বাদশ শ্রেণির সমতুল্য।
এআইসিটিই-র উপদেষ্টা এন.এইচ. সিদ্ধলিঙ্গ স্বামী নির্দেশিকায় স্পষ্ট করেছেন যে, এই সার্টিফিকেটগুলি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটিজ (AIU) এবং সরকার দ্বারা স্বীকৃত। তাই উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে এই ছাত্রছাত্রীদের অন্য যেকোনো স্বীকৃত বোর্ডের ছাত্রছাত্রীদের মতোই বিবেচনা করতে হবে।
তবে, এই নির্দেশের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও জুড়ে দিয়েছে এআইসিটিই। বৈদিক বোর্ডের সার্টিফিকেট গ্রাহ্য হলেও, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার মূল যোগ্যতা কিন্তু একই থাকছে। অর্থাৎ, বি.টেক কোর্সে ভর্তি হতে গেলে একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে অবশ্যই দ্বাদশ শ্রেণিতে (বা সমতুল্য বেদ বিভূষণে) পদার্থবিদ্যা (Physics), রসায়ন (Chemistry) এবং গণিত (Mathematics)—এই তিনটি বিষয় নিয়ে পাস করতে হবে।
মুখস্থ বনাম যুক্তি: দুই ভিন্ন ধারার সংঘাত
এই শর্তটিই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে। শিক্ষাবিদদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, যে শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো মুখস্থবিদ্যা এবং শ্রুতি, সেখান থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা কি আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিশ্লেষণাত্মক এবং গাণিতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারবে? উত্তরাখণ্ড টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ওঙ্কার সিং এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি দুই শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় জোর দেওয়া হয় ধারণার স্বচ্ছতা (Conceptual Clarity) এবং বোঝার ওপর। অন্যদিকে, বৈদিক শিক্ষায় শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করা হয় সম্পূর্ণ মুখস্থ করার ক্ষমতা এবং সঠিক উচ্চারণের ওপর ভিত্তি করে।
অধ্যাপক সিং আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এই ছাত্রছাত্রীরা ধারণাগত বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। শিক্ষার মাধ্যম বা মিডিয়াম অফ ইনস্ট্রাকশন নিয়েও সমস্যা তৈরি হতে পারে।” তাঁর ভয়, যারা মূলত স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে বড় হয়েছে, তারা ইঞ্জিনিয়ারিং মেকানিক্স বা কম্পিউটার অ্যালগরিদমের মতো বিষয়গুলোতে খেই হারিয়ে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তের সমর্থকরা এবং MSRVSSB বোর্ড দাবি করছে যে, এই আশঙ্কাগুলো অমূলক এবং বৈদিক স্কুল সম্পর্কে পুরনো ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাঁরা জোর দিয়ে বলছেন, আধুনিক গুরুকুলগুলো এখন আর শুধু পুরনো পুঁথির মধ্যে আটকে নেই। বোর্ডের দাবি অনুযায়ী, যদিও শিক্ষার মূল ভিত্তি বেদ এবং ব্যাকরণ, কিন্তু ‘বেদ বিভূষণ’ (দ্বাদশ শ্রেণি সমতুল্য) স্তরের পাঠ্যক্রমে আধুনিক বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের বর্তমান যুগের উপযোগী করে তুলতে ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোও পড়ানো হয়।
তাঁদের যুক্তি হলো, যে ছাত্রের মেধা বেদ বা উপনিষদের মতো বিশাল ও জটিল গ্রন্থ মুখস্থ করার ক্ষমতা রাখে, তার মস্তিষ্ক যথেষ্ট তীক্ষ্ণ। সঠিক প্রশিক্ষণ এবং পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও গণিতের ভিত্তি থাকলে তারা সহজেই আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণাগুলো আয়ত্ত করতে পারবে। সরকারি আধিকারিকরাও এই বিতর্ককে লঘু করে দেখছেন। তাঁদের মতে, এটি নতুন শিক্ষা নীতি (NEP 2020)-র অধীনে ভারতীয় জ্ঞানব্যবস্থাকে মূল স্রোতে আনার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মাত্র।
আসল ভয় কি অন্য কোথাও? ফাঁকা আসন ভরাটের চাপ? এই শিক্ষণ-পদ্ধতির বিতর্কের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও একটি বাস্তব এবং হয়তো কিছুটা তিক্ত সত্য। ভারতে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার বর্তমান অবস্থা। গত কয়েক বছর ধরে দেশে ইঞ্জিনিয়ারিং আসনের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। বেসরকারি কলেজগুলোতে প্রতি বছর প্রায় ৩০% থেকে ৪০% আসন ফাঁকা পড়ে থাকছে।
অধ্যাপক সিংয়ের মতো সমালোচকদের আশঙ্কা, বৈদিক ছাত্রদের ভর্তির সুযোগ দেওয়ার পেছনে শুধু শিক্ষাগত কারণ নেই, বরং বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর ফাঁকা আসন ভরাটের চাপও কাজ করছে। অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য এই কলেজগুলো হয়তো ভর্তির মানদণ্ড লঘু করে এমন ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করবে, যাদের সার্টিফিকেট আছে ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক দক্ষতা বা অ্যাপটিটিউড নেই। এর ফলে কারিগরি শিক্ষার সামগ্রিক মান পড়ে যাওয়ার এক বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমনিতেই ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির যোগ্যতা (Employability) নিয়ে প্রশ্ন আছে, এই নতুন সিদ্ধান্তে সেই সমস্যা আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভবিষ্যতের এক সাহসী পরীক্ষা
এআইসিটিই-র এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং আধুনিক আকাঙ্ক্ষাকে মেলানোর এক সাহসী পরীক্ষা। এটি সেই পুরনো দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা, যা এতদিন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা এবং আধুনিক বিজ্ঞানকে আলাদা করে রেখেছিল। যদি এই পরীক্ষা সফল হয়, তবে ভারত এক নতুন ধরণের ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে পারবে—যারা একদিকে ভারতীয় দর্শনের জ্ঞানে ঋদ্ধ, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ। এটি প্রমাণ করবে যে প্রথাগত জ্ঞানব্যবস্থাও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। কিন্তু, যদি শিক্ষণ-পদ্ধতির অমিলগুলোকে উপেক্ষা করা হয় এবং কলেজগুলো যদি শিক্ষার মানের চেয়ে আসন ভরাটকেই বেশি গুরুত্ব দেয়, তবে এই ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে পারে এবং কারিগরি শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আসন্ন শিক্ষাবর্ষে ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর করিডোরে এই নতুন ছাত্রছাত্রীদের আগমন ঘটবে। বেদের মন্ত্র উচ্চারণ থেকে যন্ত্রের ভাষা বোঝার এই যাত্রা কতটা মসৃণ বা কতটা সংঘাতপূর্ণ হবে, তা সময়ই বলবে। বেদ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রাস্তা তৈরি হয়েছে, এখন দেখার বিষয়, কারা সেই রাস্তায় সফলভাবে হাঁটতে পারে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

