Mukul Roy death: কাঁচড়াপাড়ার মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে এসে বাংলার রাজনীতিতে ‘চাণক্য’ উপাধি অর্জন, তৃণমূলের সংগঠক থেকে দিল্লির রেলমন্ত্রী, আবার বিতর্ক, BJP-তে যোগ ও নাটকীয় প্রত্যাবর্তন—মুকুল রায়ের জীবন যেন এক রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পূর্ণাঙ্গ মহাকাব্য।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলার রাজনীতিতে “চাণক্য” নামে পরিচিত এক কৌশলী সংগঠকের অধ্যায়ের ইতি ঘটল। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রাত প্রায় ১টা ৩০ মিনিটে কলকাতার সল্টলেকের এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন মুকুল রায়। বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তাঁর মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন ছেলে শুভ্রাংশু রায়। দীর্ঘদিন ডায়াবিটিস ও ডিমেনশিয়ায় ভোগার পর স্ত্রীর মৃত্যুর ধাক্কায় শারীরিক অবস্থার অবনতি আরও ত্বরান্বিত হয়।
কিন্তু মুকুল রায় কি শুধুই এক রাজনৈতিক নেতা? নাকি তিনি ছিলেন এক ব্যাকরুম স্ট্র্যাটেজিস্ট, যাঁর পরিকল্পনায় বদলে গিয়েছিল বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র? কাঁচড়াপাড়ার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে থেকে দিল্লির মন্ত্রীসভা—এই যাত্রাপথে রয়েছে নাটক, কূটনীতি, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রত্যাবর্তন এবং বিতর্ক। এই প্রতিবেদনে থাকছে তাঁর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক জীবন, উত্থান-পতন এবং উত্তরাধিকার নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ।
আরও পড়ুন :
ছাত্র রাজনীতি থেকে উত্থানের গল্প
রাজনীতির হাতেখড়ি যুব কংগ্রেসের মাধ্যমে। ছাত্র রাজনীতি থেকেই নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন মুকুল রায়। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর। ১৯৯৮ সালে যখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভেঙে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস গঠিত হয়, তখন তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব সামলান। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতায় শুধু বাংলা নয়, ত্রিপুরা, অসম-সহ উত্তর-পূর্ব ভারতে দল নিজেদের বিস্তার ঘটায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের রকেটগতির উত্থানের নেপথ্যে অন্যতম স্থপতি ছিলেন মুকুল।

দিল্লির ক্ষমতার কেন্দ্রে
২০০৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হন তিনি। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের সময় জাহাজ মন্ত্রকের দায়িত্ব পান এবং পরে রেলমন্ত্রী হন। ২০১২ সালের রেল বাজেটে ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্কের জেরে তৎকালীন রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীর ইস্তফার পর মুকুল রায় দায়িত্ব নেন। রেলমন্ত্রী হিসেবে তাঁর মেয়াদ সংক্ষিপ্ত হলেও প্রশাসনিক দাপট ও নীরব কৌশলের জন্য পরিচিত ছিলেন। একসময় বিধায়ক, রাজ্যসভার সাংসদ থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী—ক্ষমতার শিখরে পৌঁছেছিলেন তিনি। বঙ্গ রাজনীতিতে তখন তাঁকে বলা হত “সেকেন্ড-ইন-কমান্ড”।
বিতর্ক ও রাজনৈতিক দূরত্ব
সারদা ও নারদা কাণ্ডে নাম জড়ানোর পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। যদিও প্রথমদিকে তাঁকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন দলনেত্রী। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়—দলের অভ্যন্তরে শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে। অবশেষে ২০১৭ সালে তিনি তৃণমূল ছেড়ে যোগ দেন ভারতীয় জনতা পার্টি-তে। সেখানে জাতীয় সহ-সভাপতির পদ পান (২০১৭–২০২১)। কিন্তু বিজেপিতে তাঁর রাজনৈতিক অভিপ্রায় পূর্ণতা পায়নি বলেই মত অনেকের। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে জয়ী হলেও দলীয় অবস্থান ছিল অস্বস্তিকর।

বিজেপিতে পদার্পণ এবং নতুন সমীকরণ
২০১৭ সালে যখন তিনি বিজেপিতে যোগ দেন, তখন অনেকে মনে করেছিলেন তিনি ফুরিয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেন যে তিনি যেখানেই যান, রাজনীতির চাকা তাঁর সাথে ঘোরে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির ১৮টি আসন পাওয়ার নেপথ্যে মুকুল রায়ের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক ভাঙার কৌশল ছিল প্রধান শক্তি। ২০২১ সালের ১১ জুন নাটকীয়ভাবে বিজেপি ছেড়ে আবার তৃণমূলে ফেরেন মুকুল রায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ইউ-টার্ন। তবে ততদিনে তাঁর ‘চাণক্য’ তকমা অনেকটাই ফিকে। একইসঙ্গে শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে ক্রমশ সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ২০২১ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। ডায়াবিটিস ও ডিমেনশিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে করতে শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে থেমে যায় তাঁর জীবনযুদ্ধ।
মুকুল রায়কে ঘিরে প্রচারের অন্যতম কারণ ছিল তাঁর “কিংমেকার” ইমেজ। তিনি নিজে সামনে না এলেও, কার প্রার্থী হওয়া উচিত, কোথায় সংগঠন দুর্বল—এই সব বিষয়ে তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। আরও একটি কারণ ছিল তাঁর রাজনৈতিক অভিযোজন ক্ষমতা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত নতুন কৌশল নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তিনি সরাসরি কর্মীদের সাথে ফোনে কথা বলতেন, যা বড় মাপের নেতাদের মধ্যে বিরল। বিরোধী শিবিরের কোন নেতা অসন্তুষ্ট বা কোথায় ফাটল ধরানো সম্ভব, সেটা তিনি আগেভাগে আঁচ করতে পারতেন। তিনি দেখিয়েছেন, সংগঠনের ভিত মজবুত করলে এবং তথ্যভিত্তিক কৌশল নিলে কীভাবে একটি দল দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। আবার দলবদলের পরও প্রভাব বজায় রাখা কতটা কঠিন, সেটিও তাঁর জীবনের অধ্যায় থেকে স্পষ্ট।
মুকুল রায় ছিলেন না প্রচলিত অর্থে ক্যারিশম্যাটিক বক্তা। কিন্তু তিনি ছিলেন নিখুঁত সংগঠক, ব্যাকরুম স্ট্র্যাটেজিস্ট, দক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থাপক। বাংলায় বামফ্রন্টের পতন থেকে দিল্লির মন্ত্রীসভা—একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক যেন তাঁর হাত ধরেই এগিয়েছিল। তবে একইসঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ইউ-টার্ন, বিতর্ক এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটও ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। মুকুল রায়ের প্রয়াণ শুধুই এক নেতার মৃত্যু নয়; এটি এক যুগের সমাপ্তি। বাংলা রাজনীতির কৌশল, সংগঠন এবং ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ গতিবিদ্যা বুঝতে গেলে তাঁর নাম এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।
#MukulRoy #BengalPolitics #TrinamoolCongress #BJP #NewsOffBeat
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

