Charnock Lohia Hospital: গ্রেট রোমান আর্কিটেকচারের পুরনো আভিজাত্য, আর ভেতরে লেটেস্ট মেডিক্যাল টেকনোলজি। মল্লিক ও শীল বাড়ির ২০০ বছরের পুরনো দালানে শুরু হলো ২৫০ বেডের সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল। শহরের গ্রেড-১ হেরিটেজ বাঁচিয়ে এই অসাধ্য সাধন কীভাবে সম্ভব হলো? জানুন বিস্তারিত।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো! বিশাল এক রাজকীয় দালান। গ্রিক-রোমান স্টাইলের বড় বড় থাম বা পিলার। ২০ ফুট উঁচু ছাদ আর ঝাড়বাতির আলোয় গমগম করছে এক বিশাল বলরুম। আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে এই ঘরেই বসত ধ্রুপদী নাচের আসর। সেই পুরনো ‘নাচঘর’ বা বলরুমেই যদি আজ সারি সারি আধুনিক বেড, ভেন্টিলেটর আর লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম বসে, তবে কেমন লাগবে? হ্যাঁ, রূপকথার মতো মনে হলেও এটাই এখন কলকাতার বাস্তব। রবীন্দ্র সরণির বুকে, নিমতলা ঘাটের খুব কাছে ৪ বিঘা জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক ২০০ বছরের পুরনো প্রাসাদ আজ পরিণত হয়েছে এক অত্যাধুনিক সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে—যার নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘চার্নক লোহিয়া হাসপাতাল’ (Charnock Lohia Hospital)। বৃহস্পতিবার এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে এবং আগামী ৯ মার্চ থেকে এখানে রোগী ভর্তি শুরু হবে।
কী ছিল এই বাড়িতে?
ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নিওক্ল্যাসিকাল গ্রিকো-রোমান (Neoclassical Greco-Roman) স্থাপত্যে তৈরি এই বাড়িটি ছিল কলকাতার মল্লিক এবং শীল পরিবারের বাসভবন। পরবর্তীতে ১৯৪০ সালে কয়েকজন শিল্পপতির একটি গ্রুপ এই বাড়িটি অধিগ্রহণ করে এবং একে ‘লোহিয়া মাতৃ সেবা সদন’ (Lohia Matri Sewa Sadan) নামক একটি ভর্তুকিযুক্ত মেটারনিটি বা মাতৃসদন হাসপাতালে রূপান্তরিত করে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে উত্তর কলকাতার মানুষের সেবা করার পর, ২০১৭ সালে এই মাতৃসদনটি বন্ধ হয়ে যায়।
নতুন উদ্যোগ: কে নিল এই হেরিটেজ বাঁচানোর দায়িত্ব?
বাড়িটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ৭ বছর পর, চার্নক হাসপাতাল (Charnock Hospital) গ্রুপ একটি দীর্ঘমেয়াদী লিজে এই প্রপার্টিটি অধিগ্রহণ করে। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। কারণ এটি কলকাতা শহরের একটি ‘গ্রেড-১ হেরিটেজ স্ট্রাকচার’ (Grade-I heritage structure)। চার্নক হাসপাতালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রশান্ত শর্মা জানান, “আমরা ১৫ মাসের মধ্যে এই পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ করেছি। গ্রেড-১ হেরিটেজ সংরক্ষণের নিয়মকানুন জানা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনেই এই কাজ করা হয়েছে”। এই অসাধ্য সাধনের জন্য বিল্ডিংয়ের সামনের অংশ বা ‘ফ্যাকাড’ (facade)-এ সামান্যতম পরিবর্তনও করা হয়নি। ছাদের পুরনো কাঠের কড়িবরগার জায়গায় শুধু স্টিলের সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে এবং অরিজিনাল মেঝে বা ফ্লোরিং অক্ষত রাখা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, এই বাড়ির দেওয়ালগুলো ৩০ ইঞ্চি চওড়া এবং ছিদ্রযুক্ত (porous), যার ফলে গ্রীষ্মকালে ভেতরটা ঠান্ডা থাকে এবং শীতকালে গরম থাকে।
বলরুম থেকে আইসিইউ: কী কী সুবিধা থাকছে?
এটি এখন ২৫০ বেডের একটি টার্শিয়ারি ও ক্রিটিকাল কেয়ার হাসপাতাল। যে বিশাল হলঘরগুলোতে একসময় নাচের আসর বসত, আজ তা অত্যাধুনিক আইসিইউ (ICU) এবং ওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। পুরনো স্টাফ কোয়ার্টারগুলোকে প্রাইভেট কেবিনে বদলে ফেলা হয়েছে। হাসপাতালে রয়েছে ৯০টি ওয়ার্ড বেড, ২০টি প্রাইভেট কেবিন এবং ৮০টি আইসিইউ বেড।
দ্বিতীয় তলায় রয়েছে শিশুদের পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ড এবং নিওনেটাল আইসিইউ। এছাড়াও রয়েছে ৭টি অপারেশন থিয়েটার, একটি ক্যাথ ল্যাব, ১০ বেডের ইমার্জেন্সি বিভাগ, ১০ বেডের ডায়ালিসিস ইউনিট এবং রেডিওলজি বিভাগ।
কেন এই উদ্যোগ?
বড়বাজার, জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্র সরণির মতো জনবহুল এলাকায় সুপারস্পেশালিটি বেসরকারি হাসপাতালের মারাত্মক অভাব ছিল। বৃহস্পতিবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বলেন, “এই অঞ্চলে উপযুক্ত বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার চরম অভাব ছিল। এখানকার বাসিন্দাদের চিকিৎসার জন্য সল্টলেক বা দক্ষিণ কলকাতায় ছুটতে হতো। আমরা আশা করি এই হাসপাতাল শহরের এই অংশের মানুষের চিকিৎসার চাহিদা মেটাবে”। মন্ত্রী একে “শহরের মুকুটে নতুন পালক” (feather in the city’s cap) বলেও আখ্যা দেন।
এই হাসপাতালের একতলায় একটি ছোট ঘরকে ‘মিনি মিউজিয়াম’-এ রূপান্তরিত করা হয়েছে। এখানে এই পুরনো হাসপাতালের অনেক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। চমকপ্রদ তথ্য হলো, শিল্পপতি লক্ষ্মী নিবাস মিত্তাল (L.N. Mittal)-সহ শহরের বহু বিশিষ্ট মানুষের জন্ম এই হাসপাতালেই হয়েছিল! তাঁদের পুরনো বার্থ সার্টিফিকেট এবং সেকালের পুরনো এক্স-রে মেশিন এই মিউজিয়ামে প্রদর্শিত রয়েছে।
খরচ ও অনন্যতা
যদিও এই বিশাল প্রোজেক্টের সঠিক খরচের অঙ্ক প্রকাশ্যে আনা হয়নি, তবে একটি গ্রেড-১ হেরিটেজ স্ট্রাকচারকে না ভেঙে, তার ফ্লোরিং ও দেওয়াল অক্ষত রেখে অত্যাধুনিক মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট ইনস্টল করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। কলকাতায় হেরিটেজ বিল্ডিংকে রেস্তোরাঁ বা হোটেলে পরিণত করার ট্রেন্ড থাকলেও, সেটিকে ২৫০ বেডের সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে পরিণত করার ঘটনা এই প্রথম বললেই চলে।
পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্র সরণির এই ‘চার্নক লোহিয়া হাসপাতাল’ প্রমাণ করে দিল যে, অতীতকে ধ্বংস না করেও ভবিষ্যতের আধুনিকতাকে সাদরে গ্রহণ করা সম্ভব। যে ঘর একদিন শিল্পীদের নুপূরের ছন্দে মেতে থাকত, আজ সেই ঘর মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচানোর ভরসাস্থল।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

