SEBI Life Cycle Fund: সন্তানের উচ্চশিক্ষা বা নিজের অবসরের জন্য মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করছেন? সাবধান! বাজার নিয়ামক সংস্থা সেবি (SEBI) পুরনো ‘সলিউশন-ওরিয়েন্টেড’ স্কিমগুলো বাতিল করে আনছে সম্পূর্ণ নতুন ‘লাইফ সাইকেল ফান্ড’। জানুন নতুন নিয়মের খুঁটিনাটি।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: আমরা বাঙালিরা স্বভাবতই একটু সঞ্চয়ী। কষ্টার্জিত টাকা জমিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি—সন্তানকে বিদেশে পড়তে পাঠাব, মেয়ের বিয়ে দেব, কিংবা নিশ্চিন্তে একটা অবসর জীবন কাটাব। আর এই দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য ইদানীং ফিক্সড ডিপোজিটের (FD) পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ডও (Mutual Fund) আমাদের পছন্দের তালিকায় ওপরের দিকে উঠে এসেছে।
বাজারের এই সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে মিউচুয়াল ফান্ড কোম্পানিগুলো এতদিন বিভিন্ন চমকপ্রদ নামে ফান্ড বিক্রি করত—যেমন ‘চিলড্রেন্স গিফট ফান্ড’ বা ‘রিটায়ারমেন্ট সেভিংস ফান্ড’। কিন্তু এই ফান্ডগুলো কি সত্যিই আপনার লক্ষ্য পূরণের সময় আপনাকে সুরক্ষা দেয়? যখন আপনার টাকার সবথেকে বেশি দরকার, ঠিক তখনই যদি শেয়ার বাজারে ধস নামে, তাহলে কী হবে? বিনিয়োগকারীদের এই দুশ্চিন্তা দূর করতে এবং মিউচুয়াল ফান্ডের খোলনলচে বদলে ফেলতে এবার এক যুগান্তকারী প্রস্তাব আনল বাজার নিয়ামক সংস্থা সেবি (SEBI)। বৃহস্পতিবার সেবি জানিয়েছে যে, তারা বর্তমানের ‘সলিউশন-ওরিয়েন্টেড স্কিম’ ক্যাটেগরিটিকে পুরোপুরি বাতিল করছে। তার বদলে বাজারে আসছে সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের মিউচুয়াল ফান্ড—যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘লাইফ সাইকেল ফান্ড’ (Life cycle funds)।
আসুন, সহজ ভাষায় বুঝে নিই এই নতুন ফান্ডটি ঠিক কী এবং এতে আপনার কী লাভ।
‘লাইফ সাইকেল ফান্ড’ আসলে কী?
খবরের কাগজের ভাষায় বললে, এটি হলো একটি ওপেন-এন্ডেড স্কিম (open-ended scheme), যার একটি পূর্বনির্ধারিত টার্গেট ম্যাচিউরিটি ডেট (pre-determined target maturity date) থাকবে। সহজ কথায়, আপনি যখন এই ফান্ডে বিনিয়োগ করবেন, তখনই আপনি জানবেন যে কত সাল বা কত তারিখে আপনার টাকার প্রয়োজন। এই ফান্ডগুলো বিভিন্ন ধরনের সম্পদে বা অ্যাসেট ক্লাসে (asset classes) বিনিয়োগ করবে—যেমন ইক্যুইটি (শেয়ার বাজার), ডেট (বন্ড), ইনভিট (Infrastructure Investment Trusts বা InvITs), ইটিসিডি (Exchange Traded Commodity Derivatives), এবং সোনা বা রুপোর ইটিএফ (gold or silver exchange traded funds)। সেবির প্রস্তাব অনুযায়ী, এই ফান্ডগুলোর মেয়াদ বা টেনিউর হবে ন্যূনতম ৫ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৩০ বছর পর্যন্ত। বিনিয়োগকারীদের সুবিধার জন্য ৫-এর গুণিতকে এই ফান্ডের মেয়াদ অফার করা হবে (যেমন ৫, ১০, ১৫, ২০, ২৫, ৩০ বছর)।
এই ফান্ডের আসল ম্যাজিক
নতুন এই ‘লাইফ সাইকেল ফান্ড’-এর সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘গ্লাইড পাথ’। এটি এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে ফান্ডের ম্যাচিউরিটির সময় যত এগিয়ে আসবে, আপনার বিনিয়োগের ঝুঁকি তত স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। ধরে নিন, আপনার সন্তানের বয়স এখন ৫ বছর। আপনি তার ২০ বছর বয়সে কলেজ শিক্ষার জন্য একটি ১৫ বছর মেয়াদী লাইফ সাইকেল ফান্ডে বিনিয়োগ করলেন। প্রথম দিকে (ঝুঁকি নেওয়ার সময়): যখন ম্যাচিউরিটির ১৫ থেকে ৩০ বছর বাকি, তখন এই ফান্ড আপনার টাকার ৬৫ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত ইক্যুইটি বা শেয়ার বাজারে খাটাবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে আপনার টাকা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। শেষের দিকে (সুরক্ষার সময়): আপনার সন্তানের যখন কলেজে ভর্তির সময় ঘনিয়ে আসবে, অর্থাৎ ম্যাচিউরিটির ঠিক আগের এক বছরে, এই ফান্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইক্যুইটির পরিমাণ কমিয়ে ৫ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনবে। উল্টোদিকে, আপনার জমানো কর্পাস বা মূলধনকে সুরক্ষিত রাখতে সুরক্ষিত ডেট ফান্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত করা হবে।
এর ফলে, টাকা তোলার ঠিক মুখে যদি শেয়ার বাজার ক্র্যাশও করে, তবুও আপনার জমানো টাকা সুরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি সোনা, রুপো এবং ইনভিট-এ বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা ১০ শতাংশে আটকে রাখা হয়েছে।
পুরনো চিলড্রেন্স ও রিটায়ারমেন্ট ফান্ডের কী হবে?
সেবি এক কড়া নির্দেশে জানিয়েছে, বাজারে বর্তমানে যে সমস্ত চিলড্রেন্স এবং রিটায়ারমেন্ট স্কিম চালু আছে, তাতে অবিলম্বে নতুন করে বিনিয়োগ বা ফ্রেশ ইনভেস্টমেন্ট নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে এই স্কিমগুলোকে রি-ব্র্যান্ড করতে হবে অথবা একই ধরনের ঝুঁকি সম্পন্ন অন্য কোনো ফান্ডের সঙ্গে মার্জ বা মিশিয়ে দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান স্কিমগুলো এই নতুন ‘লাইফ সাইকেল ফান্ড’-এর টাইমলাইনের সঙ্গে মিশে যাবে। এর ফলে লাইফ সাইকেল ও সেক্টোরাল ডেট স্কিম মিলিয়ে মিউচুয়াল ফান্ডের ক্যাটেগরির সংখ্যা ৩৬ থেকে বেড়ে ৪০ হবে।
জানুয়ারি ৩১, ২০২৬-এর হিসেব অনুযায়ী, রিটায়ারমেন্ট এবং চিলড্রেন্স ফান্ডগুলোতে সাধারণ মানুষের প্রায় ৫৭,২৭৪.১৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে। ওয়েলথঅ্যাপ গ্রুপের (Wealthapp Group) কো-ফাউন্ডার এবং সিইও অনিন্দ্য পালচৌধুরী এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, বর্তমান বিনিয়োগকারীরা শীঘ্রই এই পরিবর্তনের নোটিশ পাবেন।
অনিন্দ্যবাবু আরও বলেন, “এটি ‘ট্রু-টু-লেবেল’ (True-to-Label) ইনভেস্টিংয়ের দিকে একটি বিশাল পদক্ষেপ। বছরের পর বছর ধরে চিলড্রেন্স ফান্ডগুলো নিছকই মার্কেটিংয়ের চমক ছিল। এখন নামের মাধ্যমেই বোঝা যাবে যে ফান্ডটি কবে ম্যাচিউর হবে (যেমন, Life Cycle Fund 2050)। এটি আবেগের জায়গা সরিয়ে একটি ডেটা-চালিত শিডিউল নিয়ে আসবে যা বিনিয়োগকারীদের কর্পাসকে সুরক্ষিত রাখবে”।
তাড়াহুড়ো করে টাকা তুললে জরিমানা
বিনিয়োগকারীরা যাতে দীর্ঘমেয়াদের জন্য টাকা রাখেন, তা নিশ্চিত করতে সেবি একটি ত্রিস্তরীয় এক্সিট লোড (tiered exit-load structure) প্রস্তাব করেছে। বিনিয়োগের প্রথম বছরের মধ্যে টাকা তুললে ৩ শতাংশ জরিমানা দিতে হবে। দুই বছরের মধ্যে তুললে ২ শতাংশ। তিন বছরের মধ্যে তুললে ১ শতাংশ এক্সিট লোড কাটা হবে। এছাড়া, একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি বা ফান্ড হাউস যেকোনো সময় সাবস্ক্রিপশনের জন্য সর্বাধিক ৬টি লাইফ সাইকেল ফান্ড খোলা রাখতে পারবে। যে ফান্ডগুলোর ম্যাচিউরিটি হতে ১২ মাসের কম সময় বাকি, সেগুলোকে নিকটবর্তী ম্যাচিউরিটি ফান্ডের সঙ্গে ইউনিথোল্ডারদের (বিনিয়োগকারীদের) সম্মতি নিয়ে মিশিয়ে দেওয়া হতে পারে।
পোর্টফোলিও ওভারল্যাপ ও স্বচ্ছতা
মিউচুয়াল ফান্ড কোম্পানিগুলো অনেক সময় আলাদা আলাদা নামে ফান্ড বিক্রি করলেও, ভেতরে ভেতরে একই কোম্পানির শেয়ার কিনে রাখে। একে বলে ‘পোর্টফোলিও ওভারল্যাপ’। সেবি এর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে।
ন্যায়সঙ্গত এবং স্বচ্ছতার স্বার্থে সেবি ফান্ড হাউসগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে যে, তাদের ক্যাটেগরি অনুযায়ী ফান্ডগুলোর মধ্যে কতটা ওভারল্যাপ আছে, তা বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি মাসে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। এছাড়া, একটি ফান্ড হাউসকে একইসঙ্গে ‘ভ্যালু’ (value) এবং ‘কন্ট্রা’ (contra) স্ট্র্যাটেজির ফান্ড অফার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে শর্ত হলো এই দুই ফান্ডের পোর্টফোলিও ওভারল্যাপ কোনোভাবেই ৫০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। একইভাবে, সেক্টোরাল (sectoral) এবং থিমেটিক (thematic) ইক্যুইটি স্কিমগুলোর ক্ষেত্রেও এই ৫০ শতাংশ ওভারল্যাপের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান স্কিমগুলোকে এই নিয়ম মানার জন্য তিন বছর সময় দেওয়া হবে, না মানলে সেগুলোকে অন্য স্কিমের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। ইনক্রেড মানি-র (InCred Money) সিইও নিতিন আগরওয়াল সেবির এই সিদ্ধান্তকে একটি “মাস্টারস্ট্রোক” বলে অবিহিত করেছেন। তিনি জানান, পোর্টফোলিও ওভারল্যাপের এই নিয়ম ফান্ডগুলোকে তাদের নির্দিষ্ট ক্যাটেগরির সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে বাধ্য করবে। অন্যদিকে, ইক্যুইটি স্কিমগুলো তাদের মূল বিনিয়োগের পর অবশিষ্ট বা রেসিডুয়াল অংশ (residual portion) সোনা এবং রুপোর ইনস্ট্রুমেন্টে বিনিয়োগ করতে পারবে বলে সেবি জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সেবির এই নতুন নিয়মাবলী সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা শুধু সুরক্ষিতই করবে না, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক লক্ষ্য পূরণে একটি বৈজ্ঞানিক এবং ডেটা-চালিত পথ দেখাবে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

