Shyamalda Untouched Shoes: দুর্গাপুরের বেনাচিতি বাজারে চার বছর পর পুরনো দোকানের সাটারে চোখে পড়ল একজোড়া না-পরা জুতোর বিজ্ঞপ্তি। কাগজে লেখা ফোন নম্বরটি ছিল পরিচিত শ্যামলদার। ফোন করতেই মিলল দোকানে আসার আমন্ত্রণ, শুরু হল এক পুরনো গল্পের খোঁজ। বিশেষ কলমে ড. সুস্মিতা প্রামাণিক
আর্ণেস্ট হেমিংওয়ের নামে চালু থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট গল্প। ছয়টা শব্দে একটা গোটা উপন্যাস।
“For sale: baby shoes, never worn.”
বিক্রির জন্য: বাচ্চার জুতো, একবারও পরা হয়নি।
এর বেশি কিছু লেখা নেই।
এই ভাবটা নিয়েই আমার নতুন গল্প –
জুতো
দুর্গাপুরের বেনাচিতি বাজারের শেষ মাথায় একটা পুরনো দোকানের সাটারে আজ চার বছর পর একটা কাগজ সাঁটা দেখলাম।
হাতের লেখা, বাংলায় –
“এক জোড়া জুতো বিক্রি আছে। ২ নম্বর। কখনো পরা হয়নি। যোগাযোগ: ৯৮…”
নিচে একটা ফোন নম্বর। আমি নম্বরটা চিনি। ওটা শ্যামলদার। আমাদের পাড়ার শ্যামলদা, যে ওষুধের দোকানে বসে।
আমি ফোন করলাম। শ্যামলদা বলল, “আরে এসো না, দোকানে এসো।”
গিয়ে দেখি, শ্যামলদার কাউন্টারের ওপর একটা ছোট্ট লাল জুতোর বাক্স। একদম নতুন। ভেতরে দুটো ছোট্ট সাদা জুতো, ফিতেওয়ালা।
বললাম, “এটা কার?”
শ্যামলদা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমার নাতির।”
আমি জানতাম, শ্যামলদার মেয়ের গত বছর সাত মাসের মাথায় মিসক্যারেজ হয়েছিল। বাচ্চাটা হয়নি।
শ্যামলদা বলল, “মেয়ে জেদ করে কিনেছিল। অনলাইনে। বলেছিল, বাবা, আগেই কিনে রাখি। ছেলে হলে পরাব। আমি বলেছিলাম, আগে হোক, তারপর কিনিস। শোনেনি।”
“এখন বিক্রি করে দিচ্ছ কেন? রেখে দাও।”
শ্যামলদা হাসল, “রেখে দিয়েছিলাম তো। এক বছর আলমারিতে ছিল। রোজ দেখতাম। মেয়েটা যখন বাপের বাড়ি আসে, ওই আলমারিটা আর খোলে না। আমি ভাবলাম, জুতোটা পড়ে থেকে থেকে ছোট হয়ে যাচ্ছে। কারো কাজে লাগুক।”
আমি বললাম, “কত দাম?”
শ্যামলদা বলল, “দাম লাগবে না। যে নেবে, সে শুধু একবার পরিয়ে ছবি পাঠিয়ে দেবে। তাহলেই হবে। আমার মেয়েকে দেখাব। বলব, দেখ, জুতোটা হাঁটছে।”
আমি বাক্সটা হাতে নিলাম। জুতোটা একবারও পরা হয়নি, ঠিকই। কিন্তু ওটার ভেতরে একটা গোটা জীবন হাঁটার অপেক্ষায় ছিল।
আমি বাক্সটা কিনিনি। আমি শ্যামলদাকে বললাম, “শ্যামলদা, এটা বিক্রি কোরো না। এটা এখানেই থাক। যে বাচ্চাটা আসেনি, সে তো কোথাও না কোথাও হাঁটছে, খালি পায়ে। ওর জন্য এক জোড়া জুতো তোলা থাক না?”
শ্যামলদা কিছু বলল না। শুধু বাক্সটা আবার কাউন্টারের নিচে নামিয়ে রাখল।
বাইরে বেরিয়ে দেখলাম, সাটারে সাঁটা কাগজটা হাওয়ায় উড়ছে। “এক জোড়া জুতো বিক্রি আছে…”
আমি কাগজটা ছিঁড়লাম না। থাক। কিছু বিজ্ঞাপন বিক্রির জন্য নয়, মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য টাঙানো থাকে। আমার চোখের সামনে শ্যামলদার হবু নাতি বা নাতনির র সেই ছোট্ট লাল জুতো জোড়া ভাসতে থাকে।।
মুখে মুখে একেই বিশ্বের ক্ষুদ্রতম গল্প বলা হয়, কিন্তু সাহিত্যের খাতায় এটা নিয়ে একটু ঝামেলা আছে।
জনপ্রিয়ভাবে এটাই সবচেয়ে ছোট। কারণ ছয়টা শব্দে একটা গোটা জীবনের ট্র্যাজেডি বলে দেওয়া – শুরু, মাঝ, শেষ সব আছে। এই জন্য স্কুলের বই থেকে শুরু করে ইন্টারনেট মিম পর্যন্ত একেই “World’s shortest short story” বলে চালানো হয়।
সাহিত্যের বিচারে এর থেকেও ছোট গল্প আছে।
অগুস্ত মন্তেরেসো র গল্প। গুয়াতেমালার লেখক। ওনার গল্পটা স্প্যানিশে, ইংরেজিতে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ৭ শব্দ – “When he woke up, the dinosaur was still there.”
এটাকে অনেক সমালোচক আসল ক্ষুদ্রতম গল্প ধরেন। ১৯৫৯ সালে লেখা।
আরও ছোট আছে। এক শব্দের গল্পও আছে। যেমন – ফ্রেডরিক ব্রাউনের গল্প। “Knock.” “Who’s there?”
এটা নিয়েও তর্ক আছে।
আসলে ব্যাপারটা রেকর্ডের নয়। “For sale: baby shoes, never worn” – কে সবচেয়ে ছোট বলা হয় তার কারণ হল, এটা সবচেয়ে বেশি সম্পূর্ণ। অন্য ছোট গল্পগুলো চমক দেয়, কিন্তু এই ছয়টা শব্দ বুকে একটা ধাক্কা দেয়। একটা না-পরা জুতো দেখলেই তোমার মাথায় একটা বাচ্চার মুখ, একটা খালি ঘর, একটা মায়ের কান্না সব মনে পড়ে যাবে।
তাই লোকে মাপে না, অনুভব করে। আর অনুভবের মাপে এটাই আজ পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে ছোট, আর সবচেয়ে বড় গল্প।
কিন্তু গল্পটার ভিতরের গল্পটা আরও মজার।
গল্পটা সবার মুখে আর্ণেস্ট হেমিংওয়ের নামে চলে, যে উনি নাকি বন্ধুদের সাথে ১০ ডলারের বাজি ধরে ন্যাপকিনে লিখেছিলেন –
For sale: baby shoes, never worn.
মানে একটা শুরু, একটা মাঝ, আর একটা শেষ – ছয়টা শব্দেই একটা গোটা জীবন।
কিন্তু মজা হল, হেমিংওয়ে এই গল্পটা লেখেননি।
গবেষকরা খুঁজে দেখেছেন, এই লাইনটার মতো বিজ্ঞাপন ১৯০৬ সাল থেকেই খবরের কাগজে বেরোচ্ছে।
১৯০৬ সালে এক কাগজে বেরিয়েছিল – “For sale, baby carriage; never been used.”
১৯১০ সালে – “Baby’s handmade trousseau and baby’s bed for sale. Never been used.”
১৯১৭ সালে উইলিয়াম আর কেন নামে একজন লেখক একটা প্রবন্ধে একটা গল্পের টাইটেল সাজেস্ট করেছিলেন – “Little Shoes, Never Worn” – এক মহিলার কথা যে তার বাচ্চাকে হারিয়েছে।
হেমিংওয়ের নামটা জুড়েছে অনেক পরে। ১৯৯১ সালে পিটার মিলার নামে এক সাহিত্য এজেন্ট তার বই Get Published! Get Produced! -এ প্রথম লেখেন যে তিনি ১৯৭৪ সালে এক সাংবাদিকের কাছে শুনেছেন, হেমিংওয়ে নাকি Luchow’s রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে এটা লিখেছিলেন। হেমিংওয়ে মারা গেছেন ১৯৬১ সালে, আর এই বাজির গল্পটা ছাপা হল ৩০ বছর পর। এর কোনো প্রমাণ নেই।
তাহলে আসল লেখক কে? কেউ জানে না। এটা এননিমাস। হয়তো কোনো এক মা বা বাবা সত্যিই খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, আর সেটাই আস্তে আস্তে গল্প হয়ে গেছে।
এই জন্যই গল্পটা এত শক্তিশালী। এর কোনো লেখক নেই, এর লেখক আমরা সবাই। যে একবারও না-পরা জুতোটা দেখেছে, সেই-ই এর লেখক হয়ে গেছে। সেই অদেখা শিশুটি বেদনার আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলজ্বল করছে সাহিত্যের চিরকালীন মাইলফলক হয়ে।।
#ShyamaldaUntouchedShoes #BenachityMarket #DurgapurStory #UntouchedShoes #HumanInterestStory #BengaliStory #EmotionalStory

