Suvendu Adhikari Political Journey | মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বিন্দুতে বিন্দুতে যেমন সিন্ধু হয়, তেমনই তিল তিল করে জনমানসে নিজের স্থান তৈরি করে আজ বাংলার রাজনীতির শিখরে শুভেন্দু অধিকারী। বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের স্মৃতি বিজড়িত মেদিনীপুরের মাটি থেকে উঠে এসে, কোলাঘাট পেরিয়ে কলকাতার রাজনীতির অলিন্দে সাম্রাজ্য বিস্তার— একসময় যা ছিল ভাবনাতীত, আজ তা বাস্তব। আর মাত্র কিছুক্ষণের অপেক্ষা। তারপরেই অখণ্ড মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের প্রথম ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন। কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক পথ, বহু উত্থান-পতন, হার-জিত এবং লড়াকু মানসিকতার এক জীবন্ত ইতিহাস এই মানুষটি। আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে ফিরে দেখা প্রয়োজন তাঁর সেই দীর্ঘ এবং নাটকীয় রাজনৈতিক যাত্রাপথ।
কাঁথির ‘যুবরাজ’ ও লড়াকু ছাত্র রাজনীতির দিনগুলি
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনীতির হাতেখড়ি কাঁথি কলেজ থেকেই। যখন তিনি কলেজের ছাত্র, তখনই কাঁথি ও সংলগ্ন এলাকার প্রায় ৭০টি ক্লাবের সম্পাদক। বয়স তখন মাত্র ২১-২২ বছর। তরুণ বুবাইকে (শুভেন্দুর ডাকনাম) সবাই চাইতেন তাঁদের পাশে। সেই সময়কার একটি ঘটনা আজ মেদিনীপুরের জনশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে। একটি দীর্ঘদিনের জায়গার সমস্যা, যা গরীব মানুষগুলো কোনোভাবেই সমাধান করতে পারছিলেন না। সরকারি আমিন নিয়ে আসার টাকা নেই তাঁদের। মুশকিল আসান হিসেবে আবির্ভূত হলেন শুভেন্দু। তিনি দুই পক্ষকে পৌরসভাতে ডাকলেন। ক্লার্ক পাঞ্জা বাবুর ঘরে সালিসী সভা শুরু হওয়ার আগেই তরুণ শুভেন্দু বললেন, “আমি শুনেছি আপনাদের টাকার অভাবে জমির বিষয়টি সমাধান হচ্ছে না।” এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের পকেট থেকে টাকা বের করে আমিনের খরচ দিয়ে দিলেন। দীর্ঘদিনের সমস্যা মিটে গেল পাঁচ মিনিটে। সালটা সম্ভবত ১৯৯৪-৯৫।
এইভাবেই মানুষের মনের কথা বুঝে কাজ করার ক্ষমতা তাঁকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে যায়। পৌরসভা নির্বাচনে ১৬ নং ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সর্বকনিষ্ঠ কাউন্সিলর হন। সেই সময় থেকেই তাঁর কঠোর নিয়মানুবর্তিতা লক্ষ্য করা যেত। প্রতিদিন ভোরবেলা ওঠা, কাঁথি রামকৃষ্ণ মিশনে যাতায়াত (যা তিনি এখনও সময় পেলেই করেন)— এসবই ছিল তাঁর জীবনযাত্রার অংশ। ততদিনে তিনি দাদু বিপিন অধিকারী (স্বাধীনতা সংগ্রামী) এবং বাবার পথে হেঁটে কংগ্রেসে যোগদান করেছেন। বাড়িতে কংগ্রেসের তাবড় নেতাদের আনাগোনা। ভবানীচকের দেশবাড়ী থেকে উঠে আসা তৎকালীন সময়ের কাঁথির ‘যুবরাজ’ বুবাই এক ডাকেই পরিচিত ছিলেন সকলের কাছে। নাম হয়েছিল ‘বিপদের বন্ধু শুভেন্দু’।
প্রথম নির্বাচনী যুদ্ধ ও হার না মানা মনোভাব
২০০১ সালে মুগবেড়িয়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বামফ্রন্টের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা কিরণময় নন্দের বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেস সমর্থিত জোটের প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল চৈতন্যময় নন্দের। কিন্তু চৈতন্যময়বাবু নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইলেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন তরুণ শুভেন্দুকে জিজ্ঞেস করলেন, “শুভেন্দু তুমি নন্দের বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়বে?” এক মুহূর্ত দেরি না করে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন শুভেন্দু।
সেই নির্বাচন ছিল এক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী। বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসে শুভেন্দু অধিকারীই সম্ভবত প্রথম প্রার্থী, যিনি নিজের ছবি দিয়ে ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিলেন। কাঁথির ‘গ্লোবাল প্রিন্টিং গ্রুপ’ থেকে ছাপা সেই ক্যালেন্ডার দোর্দণ্ডপ্রতাপ বাম জমানার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে প্রায় প্রতিটি ঘরে ও দোকানে পৌঁছে গিয়েছিল। যদিও সেই নির্বাচনে তিনি সামান্য প্রায় চার হাজার ভোটে হেরে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেই সময়ই কাঁথি লোকসভা বা পূর্ব মেদিনীপুর জেলা বুঝতে পেরেছিল, মেদিনীপুরের এই লড়াকু ছেলের রাজনৈতিক যাত্রা দীর্ঘপথ অতিক্রম করবে। ওই কেন্দ্রে হেরে যাওয়ার পরেও তিনি সরকারি নিরাপত্তা রক্ষী (তন্ময় চ্যাটার্জী) পেয়েছিলেন, যা তাঁর গুরুত্ব প্রমাণ করে।
হারের পরেও দমে যাননি তিনি। কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় প্রতিদিন ভোর পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে অরবিন্দ স্টেডিয়ামে দৌড়ে বেড়ানো, ভালোবাসার একঝাঁক যুবককে সাথে নিয়ে মর্নিংওয়াক শেষে কাঁথি টাউন হলের সামনে মন্টু বাবুর চায়ের দোকানের পাশের একটি আড্ডায় বসা— এভাবেই সংগঠন মজবুত করতে থাকেন। হরিপুরে পারমানবিক কেন্দ্র স্থাপনের খবর পেয়েই তিনি কাঁথি কার্ড ব্যাঙ্কের সামনে বিশাল সভা ডাকেন। জুনপুট, বগুড়ান শৌলা, হরিপুর থেকে প্রচুর মানুষ এসেছিল। সেদিন তিনি গর্জে উঠে বলেছিলেন, ‘হরিপুরে যদি পারমানবিক কেন্দ্র হয়ে থাকে তাহলে জালিয়ানওয়ালা বাগের ঘটনা হবে’। সেই পারমানবিক কেন্দ্র বাস্তবায়িত হয়নি, তা আজ ইতিহাস।
হলদিয়া বিজয় ও লক্ষণ শেঠের গড় পতন
এরপর লক্ষ্য ছিল লক্ষণ শেঠের দুর্গ হলদিয়া। হলদিয়াতে লক্ষণ শেঠের বিরুদ্ধে লড়ার প্রস্তুতি শুরু হলো। শুভেন্দুর জন্য কেনা হলো সুজি অ্যামবাসাডার ২০০০ সিসি গাড়ি। প্রতিদিন গোপাল বাবু তাঁকে নিয়ে ভোরবেলা বের হতেন, ফিরতেন গভীর রাতে— কখনো রাত বারোটা, কখনো রাত দুটো। ভোটার লিস্ট ধরে ধরে হলদিয়ার প্রতিটি বাড়ি ঘুরেছিলেন শুভেন্দু, সাথে কাঁথির কয়েকজন বিশ্বস্ত যুবক। ধীরে ধীরে হলদিয়াবাসীর মন জয় করলেন। আবাসনের বাসিন্দারা কাছের ছেলে হিসেবে গ্রহণ করলেন ‘বুবাই’কে। সারাদিন খাওয়া বলতে বাড়ি থেকে তৈরি করা চা-কফি ও শুকনো চিঁড়ে। সংগঠন তৈরির নেশা ও মানুষকে পাশে পাওয়ার নেশা ছিল তাঁর রক্তে। নেশা বলতে সেটুকুই।
২০০৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে লক্ষণ শেঠের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে প্রচুর ধার-দেনা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। সেই নির্বাচনে লক্ষণ শেঠকে জেতার মার্জিন কমিয়ে দিয়েছিলেন, শুভেন্দু মাত্র সাতান্ন হাজার ভোটে হেরেছিলেন। এই হারই ছিল তাঁর আগামীর জয়ের ভিত। ২০০৬ সালে দক্ষিণ কাঁথির বিধানসভা থেকে সি পি এমের সত্যেন্দ্রনাথ পন্ডাকে হারিয়ে সাড়ে আট হাজার ভোটে জয়লাভ করে বিধানসভায় যাতায়াত শুরু করলেন।
নন্দীগ্রাম আন্দোলন ও কলকাতার আঙিনায় জাঁকিয়ে বসা
মেদিনীপুরের ছেলে তখন থেকেই কলকাতায় জাঁকিয়ে বসার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন। হলদিয়ায় হার হয়েছে বলেই হলদিয়া ছেড়ে দেবেন— সেই মানসিকতা তাঁর ছিল না। লড়াকু মানসিকতা থেকেই আবার হলদিয়া যাত্রা শুরু। প্রতিদিন যাতায়াত, আর ফিরে আসার সময়ে বাজকুলে এক ডাক্তার বন্ধুর বাড়িতে কিছুটা সময় কাটানো। ২০০৭ সালে শুরু হলো শিল্প তৈরির নামে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন। দোর্দণ্ডপ্রতাপ সি পি এমের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করেই নন্দীগ্রামে প্রবেশ করলেন শুভেন্দু। হার না মানার মানসিকতা, যে কাজটি হাতে নেবেন তা শেষ না করে বিশ্রাম নেই— এই জেদই তাঁকে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কান্ডারী করে তুলল।
লড়াই ছিল অবিরত। অনেকবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। ঈশ্বর তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বাবা ও মাকে প্রণাম করা, শত ব্যস্ত থাকলেও ফোনে কথা বলা, যাওয়া-আসার পথে মা নাচিন্দাকে প্রণাম করা— তাঁর নিয়মিত কাজ। রাতে দেরি করে বাড়ি ফিরলেও বাবা ও মায়ের সাথে সাক্ষাৎ না করে তিনি ঘুমান না। মা গায়ত্রী দেবী গর্ব করে বলেন, “আমি হলাম রত্নাগর্ভা। আমার বুবাই আমার ও তাঁর বাবার খেয়াল রাখে না— এমন কথা কেউ বলতে পারবে না।”
নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় ঈশ্বর শুভেন্দুর সহায় ছিলেন। আন্দোলন চলাকালীন প্রথম পাঁশকুড়া পৌরসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়লাভের কান্ডারী ছিলেন তিনি। এরপর এল ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচন। লক্ষণ শেঠকে ১ লাখ ৭২ হাজার ভোটে হারিয়ে বিধায়ক পদ ছেড়ে সংসদের সদস্য হলেন শুভেন্দু। জয়লাভের পর প্রথম দিন যেদিন নন্দীগ্রামে এসেছিলেন, রাস্তার ভিড় এতটাই ছিল যে গাড়ি ছেড়ে তাঁকে বাইকে করে আসতে হয়েছিল। নন্দীগ্রামের মানুষ তখনই বলেছিলেন, ‘এখন থেকে নন্দীগ্রামের নবজাতক সন্তানের নাম হবে শুভেন্দু’।
‘গণনায়ক’ ও তৃণমূলের সাথে দূরত্ব
কাঁথির যুবরাজ বুবাই ধীরে ধীরে সারা জেলার নয়নের মণি হয়ে উঠলেন। মানুষের ভালোবাসায় এইচ ডি এ (HDA) সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হলেন। ২০০৯ এর পর থেকে শুভেন্দু অধিকারীর সাথে দেখা করার জন্য সকাল থেকে গভীর রাত অবধি মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। কাঁথি পৌরসভার ওয়েটিং রুমে রাত একটায় অপেক্ষা করা মানুষের জন্যও চা-জলখাবারের ব্যবস্থা থাকত। অধিকারী পরিবারের কাছ থেকে দেখা করতে গিয়ে কেউ না খেয়ে ফিরে আসেননি। সারা পশ্চিমবঙ্গ তখন শুভেন্দুকে চিনে গেছে। দূরের জেলা থেকে আসা মানুষদের জন্য একটি গেস্ট হাউস তৈরি করলেন। ভীষণ মানবদরদী মন, গোমড়া মুখ কেউ কোনোদিন দেখেনি। চায়ে ভীষণ ভালোবাসা।
২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী বৈতরণী পার হলেন শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরেই। সিঙ্গুর আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর একমাত্র নন্দীগ্রাম আন্দোলন তখন উজ্জীবিত। সারা পশ্চিমবঙ্গের কাছে নন্দীগ্রামের ইতিহাসকে তুলে ধরতে সফল হলেন তিনি। রাজ্যে পরিবর্তন এল। শিশির অধিকারী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হলেন, দিব্যেন্দু অধিকারী বিধানসভা উপ-নির্বাচনে বিধায়ক হলেন। পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় শুভেন্দু অধিকারীকে উদ্বোধক বা প্রধান বক্তা হিসেবে পেতে চাওয়া শুরু হলো। সকাল থেকে রাত অবধি উদয়াস্ত পরিশ্রম, খাওয়া-ঘুমানো গাড়ির মধ্যেই। কোনও মানুষ কোথাও বিপদে পড়লে তিনি ছুটে গেছেন। সারা পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক দলের শহীদদের দিনগুলোকে যথাযথ মর্যাদার সাথে পালন করতেন।
কিন্তু তাঁর এই খ্যাতির বিড়ম্বনাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিচলিত হয়ে পড়লেন। ধীরে ধীরে ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনীতির আঙিনায় চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সফল হওয়ার পরে কলকাতায় ‘ম্যাচ উইনার’ হিসেবে ব্যানার পড়েছিল, কিন্তু আসল কান্ডারী শুভেন্দুর নাম মুছে ফেলার প্রচেষ্টা চলল। অথচ দলের সাংগঠনিক সভার শুরু ও শেষে শুভেন্দুকেই দরকার পড়ত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দুর পরিসরকে ছোট করার জন্য সাংগঠনিক নানা পদ থেকে তাঁকে সরালেন, দলের জন্য এতটা সময় দেওয়ার পরেও তাঁকে জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য করলেন। ২০১৯ সালের তমলুক লোকসভা নির্বাচনে ভাই দিব্যেন্দু অধিকারী ও কাঁথি লোকসভা নির্বাচনে বাবা শিশির অধিকারীকে জেতানোর পরেও শুভেন্দুকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত আরও জোরালো হলো। কোভিড কালে শুভেন্দু করোনা আক্রান্ত হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একবারও ফোন করেননি।
আরও পড়ুন: বাংলায় প্রথম বিজেপি সরকার, পরিষদীয় দলের নেতা কে?
দলত্যাগ, বিজেপি-তে যোগদান ও নন্দীগ্রামের মহাযুদ্ধ
দলের সাথে দূরত্ব বাড়ার পর দল ছাড়ার আগে নন্দীগ্রামের তেখালীতে একটি বিশাল সভা করলেন। সেই সভায় ছিল তাঁর জ্বালাময়ী ভাষণ। বলেছিলেন, “আমি লিফটে চড়ে আসিনি বা হেলিকপ্টার চড়ে আসিনি, আমি এসেছি সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে।” ২০২০ সালের ১৯ শে ডিসেম্বর মেদিনীপুরের মাঠে অমিত শাহের হাত থেকে পতাকা নিয়ে যোগ দিলেন ভারতীয় জনতা পার্টিতে। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে শুভেন্দুকে হারাতে প্রার্থী হলেন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী ১৯৫৬ ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করলেন। কাঁথি থেকে নাম কাটিয়ে নন্দীগ্রামের মানুষের কাছে আপন হওয়ার জন্য নন্দনায়কবাড়-এর বাসিন্দা হলেন। যদিও লোডশেডিং তত্ত্ব দিয়ে সেই জয়ের মহিমা কমানোর চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু গণনার দিন ১৫ রাউন্ডের পর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে ইলেকট্রিক চলে যাওয়া, ইমারজেন্সি আলোতে গণনা এবং পোস্টাল ব্যালট গণনায় নানা কারচুপির অভিযোগ সত্ত্বেও শুভেন্দু অধিকারীর জয় ছিল ঐতিহাসিক। তৃণমূলের রি-কাউন্টিং-এর দাবি রিটার্নিং অফিসার নাকচ করে দিয়েছিলেন আইন মেনেই, যা পরবর্তীকালে নির্বাচন কমিশনও মান্যতা দেয়।
বিরোধী দলনেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী: এক নতুন অধ্যায়
গগত পাঁচ বছর ধরে রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা (Leader of Opposition) কাকে বলে এবং তাঁর ভূমিকা কী হওয়া উচিত, তা পশ্চিমবঙ্গের জনগণ শুভেন্দু অধিকারীর নির্ভীক কাজ দেখে মর্মে মর্মে টের পেয়েছেন। শাসকদলের চোখে চোখ রেখে কথা বলা, বিধানসভায় দুর্নীতি নিয়ে চাঁছাছোলা বক্তব্যের জন্য বারবার অন্যায়ভাবে সাসপেন্ড হওয়া— সবই তাঁর আপসহীন লড়াকু মানসিকতার উজ্জ্বল প্রমাণ। একসময় যে শুভেন্দুকে সারা পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব দিয়ে তৃণমূল নেত্রী নিশ্চিন্তে ঘুমাতেন, গত পাঁচ বছরে সেই শুভেন্দু অধিকারীই শাসকদলের রাতের ঘুম পুরোপুরি কেড়ে নিয়েছিলেন।
এবারের (২০২৬) বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম বিধানসভা থেকে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে হেভিওয়েট কেউ দাঁড়ানোর সাহসই পাননি। বরং রাজনৈতিক সাহসিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন রেখে শুভেন্দু অধিকারী খোদ ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। ঐতিহাসিক ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, দুটি কেন্দ্রেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেন শুভেন্দু অধিকারী। দল পেল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (Absolute Majority)।
মেদিনীপুরের সেই ছোট্ট ‘বুবাই’ আজ আক্ষরিক অর্থেই বাংলার ‘গণনায়ক’। তাঁর এই সুদীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাপথ প্রমাণ করে, চরম নিষ্ঠা, আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা থাকলে রাজনীতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। আজ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। মেদিনীপুরের বালু মাটি থেকে সোজা নবান্নের চোদ্দো তলা— শুভেন্দু অধিকারীর এই রাজকীয় উত্থান বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা মহাকাব্য হয়ে চিরকাল থেকে যাবে। রাজ্যবাসী এখন এক নতুন ভোরের আশায় বুক বাঁধছে।
দীর্ঘ এই যাত্রাপথে শুভেন্দু অধিকারীর কোন গুণটি আপনার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে? আগামী দিনে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে তিনি রাজ্যকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না। রাজনীতি ও রাজ্য প্রশাসনের প্রতিটি খুঁটিনাটি খবর সবার আগে পেতে চোখ রাখুন NewsOffBeat-এ।
Most Viewed Posts
- ‘মায়া ভরা রাতি’ আবার ফিরছে—অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে নতুন করে জেগে উঠবে এক চিরন্তন গান
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- বাড়িতে রাখুন এই নয় গাছ, সৌভাগ্য ফিরবেই

