Hampi Musical Pillars Mystery: কর্ণাটকের হামপিতে ভিট্ঠল মন্দিরের ৫৬টি পাথরের স্তম্ভে আঘাত করলেই ভেসে আসে সুর। কীভাবে তৈরি হয় সংগীতের সুর? ইতিহাস, স্থাপত্য ও বিস্ময়কর তথ্য এক প্রতিবেদনে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: পাথরের স্তম্ভে আঘাত করলেই বাজে সারেগামা! শুনতে যেন লোককথা, কিন্তু এটি বাস্তব। দক্ষিণ ভারতের বিটল মন্দির-এর ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা এই পাথরের স্তম্ভগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষকে বিস্মিত করে চলেছে। হাম্পিতে অবস্থিত কর্নাটকের বিটল মন্দির। মন্দিরটি অনন্য স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। হামপির বিখ্যাত ভিট্ঠল মন্দির পঞ্চদশ শতকে নির্মিত হয়। এই মন্দিরটি বিজয় নগরের রাজা দ্বিতীয় দেবরায় তৈরি করেছিলেন। তিনি ১৪২২ থেকে ১৪৪৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেছিলেন। মন্দিরটির প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে পাথরের তৈরি মিউজিক্যাল পিলার। যখন এই স্তম্ভগুলোকে ধীরে আলতো করে আঘাত করা হয়, তখন সেগুলো থেকে সংগীতের সুর ভেসে আসে। যা বাজলে বাদ্যযন্ত্রের শব্দ হয়। হাম্পি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে বিখ্যাত। ভগবান বিষ্ণুর একটি রূপ উৎসর্গ করা হয় বিটল রাজাকে। মন্দিরটি ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত। কীভাবে কঠিন গ্রানাইট পাথর থেকে বেরোয় স্বচ্ছ সংগীতের ধ্বনি? আজকের আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েও যার রহস্য পুরোপুরি ভেদ করা যায়নি, ১৫শ শতকে তা সম্ভব হলো কীভাবে? এই প্রতিবেদনে জানবেন, হাম্পির মিউজিক্যাল পিলার রহস্যের ইতিহাস, বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা, বিতর্ক এবং কেন এটি আজও গবেষকদের কৌতূহলের কেন্দ্রে।
কর্ণাটকের ঐতিহাসিক শহর হামপিতে অবস্থিত ভিট্টল মন্দিরের রঙ্গমণ্ডপে দাঁড়িয়ে থাকা ৫৬টি পাথরের স্তম্ভ আজও সংগীতের সুর তোলে। প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্য ও শব্দবিজ্ঞানের এমন নিখুঁত সমন্বয় বিশ্বের খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। হামপি ছিল শক্তিশালী বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজধানী। চতুর্দশ শতকে প্রতিষ্ঠিত এই সাম্রাজ্য দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃতি, শিল্প ও বাণিজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। বিশেষ করে রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের স্থাপত্যকলায় আসে অভূতপূর্ব উৎকর্ষ ও শৈল্পিক মহিমা। পরবর্তীতে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রসিদ্ধ শাসক রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের শাসনকালে মন্দিরের বহু অংশের সম্প্রসারণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। তাঁর শাসনকাল ছিল ১৫০৯ থেকে ১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই বিশ্ববিখ্যাত স্মারককে বর্তমান রূপ দিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
ভিট্টল মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু হয় পঞ্চদশ শতকে এবং পরবর্তীকালে তা আরও সম্প্রসারিত হয়। মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে বিখ্যাত পাথরের রথ এবং সংগীতধ্বনিযুক্ত রঙ্গমণ্ডপ। ইতিহাসবিদদের মতে, এখানে নিয়মিত নৃত্য ও সংগীতানুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। সেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছিল এই বিশেষ সংগীতধ্বনিযুক্ত স্তম্ভসমূহ, যেগুলো আজও প্রাচীন ভারতীয় কারিগরি দক্ষতার এক অনন্য সাক্ষ্য বহন করে। ভিট্ঠল মন্দিরকে শ্রী বিজয় ভিট্ঠল মন্দির নামেও ডাকা হয়। এটি ভগবান বিষ্ণুর অবতার ভগবান ভিট্ঠলকে উৎসর্গ করা হয়েছে। এক সময় এখানে ভগবান ভিট্ঠলের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। লোককথা অনুযায়ী, এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল ভগবান বিষ্ণুর ভিট্ঠল রূপের বাসস্থান হিসেবে। তবে বলা হয়, মন্দিরের অতিরিক্ত জাঁকজমক দেখে তিনি নিজের সাধারণ বাসভবনে ফিরে যান। মন্দির প্রাঙ্গণে সুদৃশ্য নকশাকরা পাথরের রথও রয়েছে, যা বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন বলে ধরা হয়। এটি ভারতের তিনটি প্রসিদ্ধ পাথরের রথের একটি; অন্য দুটি অবস্থিত ওড়িশার কোণার্ক এবং তামিলনাড়ুর মহাবলিপুরমে। ভিট্ঠল মন্দিরের পাথরের রথটি আসলে একটি মন্দির, যা অলঙ্কৃত রথের আকারে নির্মিত। এটি গরুড়কে উৎসর্গ করা হয়েছে এবং এর গর্ভগৃহে গরুড়ের প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত ছিল। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, গরুড় ভগবান বিষ্ণুর বাহন। এক সময় এই রথের চাকা ঘোরানো যেত। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি রোধে কয়েক বছর আগে সরকার সেগুলো স্থায়ীভাবে স্থির করে দেয়। একইভাবে, সংগীতধ্বনি শোনার জন্য স্তম্ভে আঘাত করাও এখন নিষিদ্ধ, কারণ দীর্ঘদিন ধরে আঘাতের ফলে কিছু ক্ষতি হয়েছে।

বর্তমানে ভিট্ঠল মন্দির আংশিকভাবে ধ্বংসাবশেষে পরিণত। গর্ভগৃহে আর কোনো মূর্তি নেই। ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে মোগল আক্রমণের সময় বিজয়নগর সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং মন্দিরের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মন্দিরে যাওয়ার রাস্তা আজ ভগ্নাবশেষে পরিণত, যা একসময় সমৃদ্ধ বাজার ছিল। এই বাজার ঘোড়ার বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল এবং রাস্তার দু’পাশে বিদেশি বণিকদের চিত্র খোদাই করা ছিল।
মোট ৫৬টি প্রধান সংগীতধ্বনিযুক্ত স্তম্ভ রয়েছে (Hampi Musical Pillars Mystery) বলে গবেষকদের ধারণা। প্রতিটি বড় স্তম্ভের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে কয়েকটি সরু উপ-স্তম্ভ। এই ছোট স্তম্ভগুলিতে আঙুল বা হালকা কাঠি দিয়ে আঘাত করলে আলাদা আলাদা সুর বের হয়—“সা, রে, গা, মা”-র মতো স্বরলিপির ধ্বনি। এই স্তম্ভগুলি গ্রানাইট পাথর দিয়ে নির্মিত এবং সম্পূর্ণ একক ব্লক থেকে খোদাই করা। ব্রিটিশ আমলে একটি স্তম্ভ কেটে ভেতরের গঠন পরীক্ষা করা হয়েছিল বলেও জনশ্রুতি রয়েছে, কিন্তু তাতে বিশেষ ফাঁপা কাঠামোর প্রমাণ মেলেনি। কিছু গবেষক মনে করেন, এটি ‘রেজোন্যান্স টিউনিং’-এর ফল। নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য, ঘনত্ব ও অনুপাতের কারণে প্রতিটি স্তম্ভ আলাদা ফ্রিকোয়েন্সিতে কম্পিত হয়। আধুনিক অ্যাকুস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও এমন নিখুঁত পাথুরে টিউনিং বিরল।
আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী, পাথরের (Hampi Musical Pillars Mystery) নিজস্ব ঘনত্ব ও স্থিতিস্থাপকতার কারণে আঘাতে সাউন্ড ওয়েভ তৈরি হয়। যদি কাঠামো এমনভাবে নকশা করা হয় যে তা নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে অনুরণিত হয়, তাহলে স্পষ্ট সুর শোনা সম্ভব। ১৯৫০-এর দশকে বিদেশি গবেষকদের পরীক্ষার উল্লেখ রয়েছে। তবে কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক রিপোর্টে স্তম্ভ সম্পূর্ণ ফাঁপা বলে প্রমাণিত হয়নি। বরং ধারণা করা হয়—স্তম্ভের অভ্যন্তরীণ মাইক্রো-স্ট্রাকচারই এই সুরের উৎস। এই মন্দির ছিল এক বিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনের সময় স্তম্ভগুলোর অনুরণন পুরো মণ্ডপে সাউন্ড অ্যাম্প্লিফায়ারের মতো কাজ করত। অর্থাৎ এটি ছিল এক প্রাচীন ‘অ্যাকুস্টিক হল’ ডিজাইন। ১৯৮৬ সালে UNESCO হাম্পিকে World Heritage Site হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। প্রায় ২৬ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই ঐতিহাসিক নগরীতে রয়েছে অসংখ্য মন্দির, বাজার, জলাধার ও প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। হাম্পির মিউজিক্যাল পিলার রহস্য শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের ঐতিহ্য গবেষণার ক্ষেত্রেও একটি অনন্য উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে—প্রাচীন ভারতীয় স্থপতি ও কারিগররা গণিত, জ্যামিতি ও সাউন্ড সায়েন্স সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন।
বর্তমানে মন্দির প্রাঙ্গণে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা রয়েছে। রাতে আলোর ছটায় এই স্থাপনা আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। প্রতিবছর এখানে পুরন্দর দাস উৎসবও পালিত হয়। প্রাচীন ভারতের এই অনন্য স্থাপত্য ও প্রকৌশল দক্ষতা আজও বিস্ময় জাগায়। হামপির সংগীতধ্বনিযুক্ত স্তম্ভ আমাদের অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে রয়েছে।
#Hampi #MusicalPillars #VittalaTemple #IndianHistory #Mystery
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

